অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির উপায় ও ঘুম বেশি হওয়ার কারণ কি?

সুস্থ থাকতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। তবে রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও যদি সারাদিন ঘুম ঘুম লাগে, কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হয় কিংবা বারবার ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা করে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। অনেকেই জানতে চান, অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির উপায় কী এবং ঘুম বেশি হওয়ার কারণ কি। কখনো অনিয়মিত জীবনযাপন, ঘুমের ঘাটতি বা মানসিক চাপের কারণে এমন হতে পারে। আবার কিছু শারীরিক সমস্যা ও ঘুমের রোগও অতিরিক্ত ঘুমের জন্য দায়ী হতে পারে।

এই আর্টিকেলে অতিরিক্ত ঘুমের সম্ভাব্য কারণ, ঘুম বেশি হলে করণীয়, দৈনন্দিন অভ্যাস পরিবর্তনের উপায় এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

ঘুম বেশি হওয়ার কারণ কি?

ঘুম বেশি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সবার ক্ষেত্রে কারণ একই হয় না। কারও পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে দিনের বেলায় ঘুম পায়, আবার কারও ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতা বা ঘুমের সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পরও ক্লান্তি দূর হয় না।

অতিরিক্ত ঘুমের কয়েকটি সাধারণ কারণ নিচে তুলে ধরা হলো।

১. রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া

রাতে দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া, মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা কম সময় ঘুমানোর কারণে শরীরে ঘুমের ঘাটতি তৈরি হয়। এই ঘাটতি পূরণ করার জন্য দিনের বেলায় বেশি ঘুম পেতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে ঘুমের চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।

২. অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি

প্রতিদিন একেক সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দকে ব্যাহত করতে পারে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করা, দেরিতে ঘুমানো এবং সকালে দেরিতে ওঠার অভ্যাস দিনের বেলায় ঝিমুনি বাড়াতে পারে।

৩. অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা

মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং দীর্ঘদিনের মন খারাপ ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আনতে পারে। কারও ঘুম কমে যায়, আবার কারও অতিরিক্ত ঘুম পেতে পারে বা ঘুমিয়েও সতেজ অনুভব হয় না।

৪. শারীরিক পরিশ্রম ও ক্লান্তি

অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, দীর্ঘ সময় কাজ করা কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়ার কারণে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে।

৫. ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া

স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea) এমন একটি ঘুমের রোগ, যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা ব্যাহত হয়। এতে ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।

জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করা, সকালে মাথাব্যথা এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া এই সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এমন লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

৬. রক্তস্বল্পতা ও থাইরয়েডের সমস্যা

রক্তস্বল্পতার কারণে দুর্বলতা, ক্লান্তি ও কাজে অনীহা দেখা দিতে পারে। একইভাবে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা কমে গেলে ক্লান্তি, ঝিমুনি এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি দেখা দিতে পারে।

তবে শুধু বেশি ঘুম পাওয়া দেখে রক্তস্বল্পতা বা থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজনে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করেন।

৭. ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যা

ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণে ক্লান্তি ও অবসাদ দেখা দিতে পারে। শরীরে পানিশূন্যতা, কিছু সংক্রমণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যাও দুর্বলতা বাড়াতে পারে।

৮. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কিছু অ্যালার্জির ওষুধ, ঘুমের ওষুধ, উদ্বেগ কমানোর ওষুধ এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যথানাশক ওষুধের কারণে ঝিমুনি হতে পারে।

কোনো ওষুধ খাওয়ার পর অতিরিক্ত ঘুম পেলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। নিজের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করবেন না।

৯. বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা

বিষণ্নতার কারণে কারও ঘুম কমে যেতে পারে, আবার কারও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘুম হতে পারে। এর পাশাপাশি আগ্রহ কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ, শক্তি কমে যাওয়া এবং মনোযোগের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

এ ধরনের সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উপকারী।

১০. অতিরিক্ত ঘুমের বিশেষ কিছু রোগ

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ঘুমের পরও দিনের বেলায় প্রবল ঘুম পায়। এর পেছনে হাইপারসমনোলেন্স বা অতিরিক্ত দিনের ঘুমভাবের সমস্যা, নারকোলেপসি কিংবা অন্য কোনো ঘুমের রোগ থাকতে পারে।

এসব সমস্যার সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির উপায়

অতিরিক্ত ঘুম কমানোর জন্য প্রথমে এর কারণ বোঝা জরুরি। জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলে অনেক ক্ষেত্রে দিনের বেলার ঝিমুনি কমানো সম্ভব। তবে কোনো রোগের কারণে সমস্যা হলে শুধু অভ্যাস পরিবর্তন যথেষ্ট নাও হতে পারে।

১. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমান

অতিরিক্ত ঘুম কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি মেনে চলা। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।

ছুটির দিনেও ঘুমের সময়সূচিতে খুব বেশি পরিবর্তন না আনাই ভালো। এতে শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দ বজায় রাখতে সুবিধা হয়।

২. পর্যাপ্ত রাতের ঘুম নিশ্চিত করুন

প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। আপনি যদি প্রতিদিন মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা ঘুমান, তাহলে দিনের বেলায় ঘুম পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

আরও পড়ুন  মুখের কালো দাগ দূর করার উপায় ও টিপস 2026

তাই ঘুম কমিয়ে অতিরিক্ত ঘুম দূর করার চেষ্টা করবেন না। বরং রাতে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করুন।

৩. সকালে ঘুম থেকে উঠে আলো-বাতাসে থাকুন

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোতে থাকুন। সম্ভব হলে সকালে বাইরে হাঁটুন বা বারান্দায় সময় কাটান।

সকালের আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে দিনের বেলায় সতর্ক থাকা এবং রাতে সময়মতো ঘুমাতে সুবিধা হতে পারে।

৪. নিয়মিত ব্যায়াম করুন

প্রতিদিন হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা অন্যান্য শারীরিক কার্যকলাপ শরীরের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

শুরুতে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করতে পারেন। নিজের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে ব্যায়ামের সময় বাড়ান।

তবে ঘুমানোর ঠিক আগে খুব তীব্র ব্যায়াম করলে কারও কারও ঘুমে সমস্যা হতে পারে। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী ব্যায়ামের সময় ঠিক করুন।

৫. ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার কমান

ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘুমের সময় পিছিয়ে যেতে পারে। উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও দেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলেও ঘুমাতে দেরি হতে পারে।

তাই ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করুন। এর পরিবর্তে বই পড়া, হালকা গান শোনা বা আরামদায়ক কোনো কাজ করতে পারেন।

৬. দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো এড়িয়ে চলুন

দুপুরে অল্প সময় বিশ্রাম নেওয়া অনেকের জন্য উপকারী। কিন্তু দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে রাতে ঘুমাতে দেরি হতে পারে। এতে পরের দিন আবার বেশি ঘুম পেতে পারে।

প্রয়োজন হলে দুপুরের দিকে ১০ থেকে ২০ মিনিটের ছোট ঘুম নিতে পারেন। বিকেলের শেষ ভাগে বা সন্ধ্যায় দীর্ঘ সময় ঘুমানো এড়িয়ে চলুন।

তবে রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও যদি প্রতিদিন দিনের বেলায় ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে শুধু ন্যাপ কমানোর চেষ্টা না করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করুন।

৭. সুষম খাবার খান

শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সুষম খাবার গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, ডিম, মাছ, দুধ বা অন্যান্য উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস রাখুন।

একবারে অতিরিক্ত ভারী খাবার খেলে কারও কারও খাওয়ার পর ঝিমুনি বাড়তে পারে। তাই পরিমিত খাবার খান এবং দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।

৮. পর্যাপ্ত পানি পান করুন

শরীরে পানির ঘাটতি হলে ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তাই সারা দিনে নিয়মিত পানি পান করুন।

তবে শুধু পানি পান করলেই সব ধরনের অতিরিক্ত ঘুম দূর হবে না। পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও সমস্যা থাকলে অন্য কারণ বিবেচনা করতে হবে।

৯. চা-কফি পান করার সময় ঠিক রাখুন

চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সতর্কতা বাড়াতে পারে। তবে বিকেল বা সন্ধ্যার পরে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে রাতে ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে এবং পরের দিন ক্লান্তি বাড়তে পারে।

তাই ঘুমানোর অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন। ক্যাফেইনের প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়।

অতিরিক্ত ঘুম কমানোর জন্য নিয়মিত বেশি চা, কফি বা এনার্জি ড্রিংক পান করা ভালো সমাধান নয়।

১০. মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন

দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ ঘুমের মান খারাপ করতে পারে। তাই প্রতিদিন নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখুন।

গভীর শ্বাস নেওয়া, হালকা ব্যায়াম, পছন্দের কাজ করা এবং কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করতে পারে। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে পেশাদার সহায়তা নিন।

১১. ঘুমানোর পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন

ঘুমানোর ঘর যতটা সম্ভব শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন। ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত আলো, শব্দ এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা কমিয়ে দিন।

বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার না করে বিছানাকে মূলত ঘুম ও বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।

১২. প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার ও ব্যায়ামের পরও যদি অতিরিক্ত ঘুম চলতে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আপনার উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, ঘুমের রোগ বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করতে পারেন। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা বা ঘুমের বিশেষ পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।

ঘুম বেশি হলে কী কী সমস্যা হতে পারে?

অতিরিক্ত ঘুমের কারণে দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা এবং কর্মক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে দিনের বেলায় ঘুমভাব থাকলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

অতিরিক্ত ঘুম বা দিনের বেলার ঝিমুনির সঙ্গে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেগুলো হলো:

  • কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়া।
  • পড়াশোনায় মন না বসা এবং স্মৃতিশক্তির কার্যকারিতা কমে যাওয়া।
  • সারাদিন ক্লান্তি ও অবসাদ অনুভব করা।
  • কাজের গতি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া।
  • গাড়ি চালানো বা যন্ত্র পরিচালনার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।
  • ঘুমের সমস্যার কারণে দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়া।
আরও পড়ুন  দ্রুত ঘুম আসার উপায় ও দোয়া 2026

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, দীর্ঘ সময় ঘুমানো মানেই সব সময় কোনো রোগ হয়েছে এমন নয়। ঘুমের প্রয়োজন বয়স, শারীরিক অবস্থা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। তবে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গে ক্লান্তি বা অন্যান্য উপসর্গ থাকলে কারণ নির্ণয় করা দরকার।

অতিরিক্ত ঘুম কমাতে দৈনিক রুটিন

অতিরিক্ত ঘুম কমানোর জন্য একটি নিয়মিত রুটিন অনুসরণ করতে পারেন। নিচের সময়গুলো উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। নিজের কাজ ও ঘুমের প্রয়োজন অনুযায়ী সময় পরিবর্তন করুন।

সময় করণীয়
সকাল ৬:৩০–৭:০০ ঘুম থেকে ওঠা ও প্রাকৃতিক আলোতে থাকা
সকাল ৭:০০–৭:৩০ হালকা হাঁটা বা ব্যায়াম
সকাল ৭:৩০–৮:৩০ নাশতা ও দিনের কাজ শুরু
দুপুর ১:০০–২:০০ পরিমিত দুপুরের খাবার
দুপুরের পর প্রয়োজন হলে ১০–২০ মিনিট বিশ্রাম
বিকেল হাঁটা, ব্যায়াম বা পছন্দের কাজ
সন্ধ্যা চা-কফি কমানো এবং মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা
রাত ৯:৩০–১০:০০ স্ক্রিন ব্যবহার কমিয়ে ঘুমের প্রস্তুতি
রাত ১০:০০–১১:০০ পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য বিছানায় যাওয়া

এই রুটিন অনুসরণ করলেও নিজের জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের সময় রাখতে হবে। শুধু সকালে তাড়াতাড়ি ওঠার জন্য রাতের ঘুম কমিয়ে দিলে দিনের বেলার ঝিমুনি আরও বেড়ে যেতে পারে।

অতিরিক্ত ঘুম হলে কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

কিছু লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

  • রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও নিয়মিত দিনের বেলায় ঘুম পেলে।
  • ঘুমের কারণে পড়াশোনা, চাকরি বা দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হলে।
  • জোরে নাক ডাকা বা ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ থাকলে।
  • দীর্ঘ সময় ঘুমিয়েও শরীর সতেজ না লাগলে।
  • অস্বাভাবিক দুর্বলতা, ফ্যাকাশে ভাব বা অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গ থাকলে।
  • নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর অতিরিক্ত ঝিমুনি দেখা দিলে।

বিশেষ করে গাড়ি চালানোর সময় ঘুম পেলে নিরাপদ স্থানে থামুন। ঘুমভাব থাকা অবস্থায় গাড়ি চালানো বিপজ্জনক।

যদি হঠাৎ অতিরিক্ত তন্দ্রার সঙ্গে বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা শরীরের একপাশ দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে জরুরি চিকিৎসা নিন।

অতিরিক্ত ঘুম নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. ঘুম বেশি হওয়ার প্রধান কারণ কি?

ঘুম বেশি হওয়ার সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি, মানসিক চাপ, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ঘুমের রোগ। এ ছাড়া রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা ও অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার কারণেও ক্লান্তি ও ঝিমুনি হতে পারে।

২. অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তির উপায় কী?

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও ওঠা, পর্যাপ্ত রাতের ঘুম নিশ্চিত করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, সকালে প্রাকৃতিক আলোতে থাকা এবং ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার কমানো উপকারী। তবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৩. প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমানো কি স্বাভাবিক?

কিছু পরিস্থিতিতে, যেমন ঘুমের ঘাটতি পূরণ করা বা অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার সময়, বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক কেউ নিয়মিত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমিয়েও ক্লান্ত থাকলে বা দিনের বেলায় ঘুম পেলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

৪. দুপুরে ঘুমালে কি রাতে ঘুমের সমস্যা হয়?

দুপুরে ১০ থেকে ২০ মিনিটের ছোট ঘুম অনেকের জন্য উপকারী। কিন্তু দীর্ঘ সময় বা বিকেলের শেষ দিকে ঘুমালে রাতে ঘুমাতে দেরি হতে পারে। তাই দুপুরে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প সময় বিশ্রাম নেওয়া ভালো।

৫. কোন ভিটামিনের অভাবে বেশি ঘুম পায়?

ভিটামিন বি১২ বা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি এবং আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার সঙ্গে ক্লান্তি ও দুর্বলতার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে অতিরিক্ত ঘুমের জন্য শুধু ভিটামিনের অভাবকেই দায়ী করা যায় না। প্রয়োজন ছাড়া পরীক্ষা না করে বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভিটামিন ও আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।

৬. অতিরিক্ত ঘুম কমানোর ওষুধ আছে কি?

কিছু নির্দিষ্ট রোগের কারণে অতিরিক্ত দিনের ঘুমভাব হলে চিকিৎসক ওষুধ দিতে পারেন। কিন্তু কারণ না জেনে নিজে থেকে ঘুম কমানোর ওষুধ, উত্তেজক ওষুধ বা অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করা নিরাপদ নয়।

৭. বেশি ঘুমালে কি শরীরের ক্ষতি হয়?

শুধু বেশি সময় ঘুমানোর কারণে সব সময় শরীরের ক্ষতি হয় না। তবে দীর্ঘদিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমের প্রয়োজন হওয়া বা অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গে ক্লান্তি ও অন্যান্য উপসর্গ থাকা কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

উপসংহার

অতিরিক্ত ঘুম থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমে ঘুম বেশি হওয়ার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি, পর্যাপ্ত রাতের ঘুম, সুষম খাবার, ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস দিনের বেলার ঝিমুনি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

তবে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও যদি প্রতিদিন অতিরিক্ত ঘুম পায়, দীর্ঘ সময় ঘুমিয়েও ক্লান্ত লাগে কিংবা ঘুমের কারণে স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ অনুযায়ী সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়।

We will be happy to hear your thoughts

Leave a reply

Amar Sikkha
Logo