
কবির ভাষায় ‘ধানের দেশ গানের দেশ, তেরশত নদীর দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতোটাই মধুর যে এই দেশ নিয়ে বিভিন্ন কবি তাদের ভাষায় বিভিন্ন কবিতা রচনা করেছেন। আজকে আমাদের মূল বিষয় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রচনা ২০ পয়েন্ট যা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও আপনারা যারা চাকরি পরীক্ষা দিবেন তারাও পড়তে পারেন।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রচনা ২০ পয়েন্ট
১. ভূমিকা:
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। এ দেশের সবুজ মাঠ, নদী, পাহাড়, বন, ফুল, ফল ও পাখি প্রকৃতিকে সুন্দর করে তুলেছে। ছয় ঋতুর এই দেশে প্রতিটি ঋতুতে প্রকৃতি নতুন নতুন রূপ ধারণ করে। কোথাও নদীর কলকল ধ্বনি, কোথাও পাখির মিষ্টি ডাক, আবার কোথাও সবুজ ফসলের মাঠ দেখা যায়। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখা যায়। তাই বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ বলা হয়।
২. বাংলাদেশের পরিচয়:
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। এ দেশের আয়তন খুব বেশি না হলেও প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যে এটি সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। এ দেশের মাটি খুব উর্বর এবং আবহাওয়া কৃষিকাজের জন্য উপযোগী। নদী, খাল, বিল, পাহাড় ও বনভূমি আমাদের দেশকে এক বিশেষ সৌন্দর্য দান করেছে।
৩. সবুজ শ্যামল প্রকৃতি:
বাংলাদেশকে সবুজ শ্যামল দেশ বলা হয়। এ দেশের দিকে তাকালে চারদিকে সবুজের সমারোহ চোখে পড়ে। গ্রামের মাঠে সবুজ ধানক্ষেত, রাস্তার পাশে সারি সারি গাছ এবং বাড়ির আঙিনায় নানা ধরনের গাছপালা দেখা যায়। বর্ষাকালে প্রকৃতি আরও সতেজ ও সবুজ হয়ে ওঠে। মাঠের পর মাঠ সবুজ ফসল দেখতে খুব সুন্দর লাগে। বাংলাদেশের এই সবুজ প্রকৃতি মানুষের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
৪. নদ-নদী:
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের বুকের ওপর দিয়ে অসংখ্য নদী বয়ে গেছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণফুলী বাংলাদেশের প্রধান নদী। নদীর দুই পাশের সবুজ গাছপালা, জেলেদের নৌকা এবং পানির ঢেউ এক মনোরম দৃশ্য তৈরি করে। নদী আমাদের কৃষিকাজ, যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে নদ-নদীর অবদান অনেক।
৫. গ্রামের সৌন্দর্য:
বাংলাদেশের গ্রামগুলো প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার। গ্রামের চারদিকে সবুজ মাঠ, পুকুর, বাঁশঝাড়, গাছপালা ও ছোট ছোট ঘরবাড়ি দেখা যায়। সকালে পাখির মিষ্টি ডাক এবং বিকেলে মাঠের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাস মনকে শান্ত করে। বর্ষাকালে গ্রামের খাল-বিল পানিতে ভরে ওঠে। শীতকালে কুয়াশায় ঢাকা গ্রামের দৃশ্য আরও সুন্দর লাগে। গ্রামের এই শান্ত ও মনোরম পরিবেশ আমাদের মুগ্ধ করে।
৬. ছয় ঋতুর দেশ:
বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ হিসেবে পরিচিত। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এই ছয়টি ঋতু নিয়ে আমাদের বছর গঠিত। প্রতিটি ঋতুর রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য। গ্রীষ্মে নানা ধরনের ফল পাওয়া যায়, বর্ষায় চারদিকে পানি দেখা যায়, শরতে কাশফুল ফোটে, হেমন্তে ধান পাকে, শীতে কুয়াশা পড়ে এবং বসন্তে নতুন ফুল ফোটে। ঋতুর এই পরিবর্তন বাংলাদেশের প্রকৃতিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
৭. গ্রীষ্মকাল:
গ্রীষ্ম বাংলাদেশের প্রথম ঋতু। এ সময় প্রচণ্ড গরম পড়ে এবং মাঝে মাঝে কালবৈশাখী ঝড় হয়। গ্রীষ্মকালে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ও তরমুজসহ নানা ধরনের সুস্বাদু ফল পাওয়া যায়। গাছে গাছে পাকা ফলের সমারোহ দেখা যায়। দুপুরের গরমে মানুষ কষ্ট পেলেও বিকেলের ঝড়-বৃষ্টি প্রকৃতিকে কিছুটা শান্ত করে। গ্রীষ্মের ফল ও কালবৈশাখীর বৃষ্টি আমাদের প্রকৃতিতে আলাদা সৌন্দর্য এনে দেয়।
৮. বর্ষাকাল:
বর্ষাকালে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং প্রচুর বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির পানিতে নদী, খাল, বিল ও পুকুর ভরে ওঠে। মাঠে-ঘাটে পানি জমে এক নতুন দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। এ সময় কৃষকেরা জমিতে বিভিন্ন ফসলের চাষ করেন। নদীতে নৌকা চলাচল করে এবং জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। বৃষ্টির শব্দ, নদীর ঢেউ ও চারপাশের সবুজ প্রকৃতি বর্ষাকালকে সুন্দর করে তোলে।
৯. শরৎকাল:
শরৎকাল বাংলাদেশের একটি সুন্দর ঋতু। এ সময় আকাশ পরিষ্কার ও নীল থাকে। আকাশে সাদা সাদা মেঘ তুলার মতো ভেসে বেড়ায়। নদীর ধারে এবং মাঠের পাশে কাশফুল ফুটে চারদিকে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে। শরতের সকালে হালকা বাতাস ও রোদ প্রকৃতিকে আরও মনোরম করে তোলে। এ সময়ের সুন্দর পরিবেশ মানুষের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
১০. হেমন্তকাল:
হেমন্তকাল বাংলাদেশের ষষ্ঠ ঋতু। এ সময় মাঠে মাঠে ধান পেকে সোনালি রং ধারণ করে। কৃষকেরা আনন্দের সঙ্গে ধান কেটে ঘরে তোলেন। নতুন ধান দিয়ে নানা ধরনের খাবার তৈরি করা হয় এবং নবান্ন উৎসব পালন করা হয়। হেমন্তের সকালে ঘাসের ওপর শিশির জমে থাকে। সোনালি ধানের মাঠ, হালকা শীতের বাতাস ও নতুন ফসলের আনন্দ বাংলাদেশের প্রকৃতিকে এক অন্য রূপ দেয়।
১১. শীতকাল:
শীতকাল বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত ঋতু। এ সময় সকালে চারদিকে ঘন কুয়াশা দেখা যায়। ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দু মুক্তার মতো ঝলমল করে। শীতকালে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, মুলা ও নানা ধরনের শীতের সবজি পাওয়া যায়। এ সময় খেজুরের রস ও পিঠাপুলির প্রচলন রয়েছে। গ্রামের মানুষ আগুন পোহায় এবং শীতের সকালে রোদ উপভোগ করে। শীতকাল বাংলাদেশের প্রকৃতিতে এক সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
১২. বসন্তকাল:
বসন্তকে ঋতুরাজ বলা হয়। শীতের শেষে বসন্ত আসে এবং প্রকৃতি নতুন সাজে সেজে ওঠে। এ সময় গাছে গাছে নতুন পাতা গজায় এবং নানা রঙের ফুল ফোটে। কোকিলের মিষ্টি ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। শিমুল, পলাশ ও কৃষ্ণচূড়া ফুলের সৌন্দর্য প্রকৃতিকে রঙিন করে তোলে। বসন্তের মৃদু বাতাস ও সুন্দর আবহাওয়া মানুষের মনে আনন্দ সৃষ্টি করে। তাই বসন্তকে প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর ঋতুগুলোর একটি বলা হয়।
১৩. ফুলের সৌন্দর্য:
ফুল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ। এ দেশে নানা ধরনের ফুল ফোটে। গোলাপ, জবা, বেলি, শিউলি, পদ্ম, শাপলা, গাঁদা, শিমুল ও পলাশ আমাদের পরিচিত ফুল। গ্রামের বাড়ির আঙিনা, বাগান, মাঠ ও পুকুরে এসব ফুল দেখা যায়। ফুলের সুন্দর রং ও মিষ্টি গন্ধ মানুষের মনকে আনন্দিত করে। বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা। ফুলের সৌন্দর্য আমাদের প্রকৃতিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
১৪. পাখির সৌন্দর্য:
বাংলাদেশকে পাখির দেশও বলা যায়। এ দেশে নানা ধরনের দেশি ও অতিথি পাখি দেখা যায়। দোয়েল, কোকিল, শালিক, টিয়া, ঘুঘু, মাছরাঙা ও বক আমাদের পরিচিত পাখি। সকালে গাছের ডালে বসে পাখিরা মিষ্টি সুরে ডাকতে থাকে। নদী ও পুকুরের ধারে মাছরাঙা ও বকের দেখা মেলে। শীতকালে অনেক অতিথি পাখি আমাদের দেশে আসে। পাখির কলকাকলি প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
১৫. পাহাড়ের সৌন্দর্য:
বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অনেক উঁচু পাহাড় রয়েছে। পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজ গাছপালা এবং আঁকাবাঁকা রাস্তা দেখতে খুব সুন্দর লাগে। কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে ঝরনা নেমে আসে। পাহাড়ের ওপর থেকে দূরের সবুজ প্রকৃতি ও মেঘের দৃশ্য মনকে মুগ্ধ করে। প্রতিবছর অনেক মানুষ পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসব স্থানে বেড়াতে যান।
১৬. সমুদ্রসৈকত:
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ হলো সমুদ্রসৈকত। কক্সবাজার বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত সমুদ্রসৈকত। এখানে রয়েছে বিশাল সমুদ্র, দীর্ঘ বালুকাবেলা ও নীল পানির ঢেউ। সমুদ্রের গর্জন এবং ঢেউয়ের ওঠানামা দেখতে খুব ভালো লাগে। সকালে সূর্যোদয় ও বিকেলে সূর্যাস্তের দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকেও সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। এসব সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশের সৌন্দর্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরে।
১৭. সুন্দরবন:
সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। সুন্দরবনে রয়েছে নানা ধরনের গাছপালা ও বন্য প্রাণী। এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানর, কুমির ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায়। সুন্দরবনের নদী, খাল, গাছপালা ও বন্য প্রাণী এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। সুন্দরবন আমাদের ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সুন্দরবন আমাদের দেশের অমূল্য সম্পদ।
১৮. ফসলের মাঠ ও কৃষি প্রকৃতি:
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। গ্রামের মাঠে ধান, পাট, গম, সরিষা, ভুট্টা ও নানা ধরনের ফসল উৎপন্ন হয়। পাকা ধানের সোনালি রং এবং সরিষা ফুলের হলুদ মাঠ দেখতে অত্যন্ত সুন্দর লাগে। কৃষকেরা কঠোর পরিশ্রম করে এসব ফসল উৎপাদন করেন। কৃষি আমাদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
১৯. প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় আমাদের করণীয়:
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। বর্তমানে গাছ কাটা, বনভূমি ধ্বংস, নদী দূষণ ও পরিবেশ দূষণের কারণে প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সমস্যা দূর করতে আমাদের বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। নদী, খাল ও বিলের পানি পরিষ্কার রাখতে হবে। বন্য প্রাণী শিকার বন্ধ করতে হবে এবং বনভূমি রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি সবাইকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাহলেই আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধরে রাখা সম্ভব হবে।
২০. উপসংহার:
বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের গর্ব ও অহংকার। নদী, পাহাড়, বন, সমুদ্র, সবুজ মাঠ ও ছয় ঋতুর বৈচিত্র্য বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে একটি সুন্দর দেশ হিসেবে পরিচিত করেছে। প্রকৃতি আমাদের জীবনকে সুন্দর ও আনন্দময় করে তোলে। তাই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি প্রকৃতির যত্ন নিই, তাহলে বাংলাদেশ আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। দেশের এই অপরূপ সৌন্দর্য রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
