
বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে গল্পের লিংক আজকে আপনাদের সাথে শেয়ার করব। এছাড়াও Amritto Valobashi Toke (PDF) আপনাদের সাথে শেয়ার করব। আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে এটি একটি রোমান্টিক উপন্যাস বই। এই বইটির সবচেয়ে রোমাঞ্চকর লাইন হলোঃ
অদৃশ্য এক মায়াবী স্বপ্নঘোর মুহূর্তেই মন ভালো করে দিয়ে যায়। অদ্ভুত এক অনূভুতি মনপিঞ্জরে সুখের আভাস ছড়ায়। হৃদয়ে প্রণয়ের মোহ জাগায়। গোধূলিবেলার রোদ্রময়ী আকাশ দেখে অজান্তেই বক্ষস্পন্দন কম্পিত হয়। হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে প্রবলভাবে কারো শূন্যতা অনুভব করে। এই শূন্যতার নাম নেই, রং নেই আর কোনো রূপও নেই। শহরের বুকে সন্ধ্যে নামলে নিয়নবাতির হলদে আলোর ভিড়ে সেই শূন্যতা বিলীন হয়ে যায়। মেঘ আনমনে নিজেকে প্রশ্ন করে,
“কাকে মিস করি আমি? আর কেনোই বা মিস করি?”
বর্ষণের অশ্রান্ত আকাশের মতো প্রশ্নগুলোও বিধ্বস্ত প্রায়। যার উত্তর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আবার কখনো-সখনো মনে হয় কারো আরত্তে আবদ্ধ হয়ে আছে। কেউ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে তাকে আর ক্ষণেক্ষণে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে যাচ্ছে,
“আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে।”
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে গল্পের লিংক ও PDF
বইটি ডাউনলোড করার আগে প্রথমে কিছু অংশ পড়ে নেওয়া যাক-
ঝরা শরতের আগমন ঘটেছে। পূর্ব দিগন্তের বিভাবসুর আলো শিশিরভেজা সবুজ ঘাসেদের রাঙিয়ে দিচ্ছে। রৌদ্র-ছায়ার মাঝে, একটা মরা গাছের মগডালে বসে কৃষ্ণবর্ণের একজোড়া ময়না পাখি খকখক করে ডেকে যাচ্ছে। পরিত্যক্ত স্থানে অযত্নে বেড়ে ওঠা গগনশিরীষ গাছের সাদাটে ফুলের সুবাসে শরতের। চারপাশ মোহিত হয়ে আছে। শরতের এই অনিন্দ্য রূপের মাঝেও কোথাও যেন একরাশ বিষাদময়তায় নিরন্তর বুক কাঁপছে।
রেলস্টেশনের চত্বরে ইস্পাতের বেঞ্চে বসে আছেন এক মধ্যবয়স্ক নারী।
বয়স ৫০-এর কাছাকাছি। গায়ের রং ধবধবে ফরসা না হলেও বয়সের তুলনায় সফেদ বলা চলে। পরনে কালো বোরকা, চুল শ্যাওলা রঙের ওড়নায় আবৃত। মধ্যবয়স্কার নিষ্প্রাণ দৃষ্টি অদূরে প্রতীক্ষমাণ ট্রেনের দিকে। আলো-ছায়ায় পূর্ণ জীবনের মাঝেও অনুভূতির দেওয়াল যেন চূর্ণ হয়ে গেছে। মস্তিষ্ক আজ বিধ্বস্তপ্রায়। মিনিট দুয়েকের মধ্যে ট্রেন মন্থরগতিতে স্টেশন ত্যাগ করল। মধ্যবয়স্কার দৃষ্টি অবিচল। চোখের কার্নিশ বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গাল-ঘেঁষে নামতেই একটা সমর্থ হাত কাঁধ স্পর্শ করল। মধ্যবয়স্ক এক পুরুষ কণ্ঠে কোমলতা মিশিয়ে ডাকলেন,
“মাহমুদা।”
ভদ্রমহিলা নিঃশব্দে অশ্রু মুছে চোখ তুলে তাকালেন। সহসা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করলেন। মধ্যবয়স্ক লোকের ঠোঁটে হাসির পরিবর্তে
চেহারায় উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট দেখা গেল। চিন্তিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন, “কাঁদছো কেন?”
“কতগুলো বছর পর জন্মভূমিতে পা রাখলাম। ভাবতেও পারিনি, আবার কোনোদিন এই মাটিতে পা রাখব!”
“আমরা যা ভাবি তা সবসময় ঠিক হয় না। কখনো কখনো ঠিক সেটাই হয় যেটা আমরা কল্পনাও করি না।”
মধ্যবয়স্ক লোক অবচেতন মনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। ভদ্রলোকের নাম আমিনুল ইসলাম। বর্তমানে ঢাকায় এয়ার মার্শাল পদে কর্মরত অবস্থায় আছেন। ভদ্রমহিলার নাম মাহমুদা খান আমিনা। তাঁরা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী।
আমিনুল ইসলাম পুরু কণ্ঠে বললেন, “খাবে চলো।”
মাহমুদা তৎক্ষণাৎ বললেন, “খিদে নেই।”
“সারারাত কিছুই খাওনি। এভাবে না খেয়ে থেকে শরীর খারাপ করার কোনো মানে হয় না। তুমি গ্রামে আসতে চেয়েছো আমি নির্দ্বিধায় তোমাকে নিয়ে এসেছি। একটা বারের জন্য বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করিনি। তুমি এখন না খেলে শরীর খারাপ হবে। বাড়িতে কোনো একটা অঘটন ঘটলে কী হবে ভাবতে পারছো?”
মাহমুদা মলিন গলায় বললেন, “আমার খুব ভয় হচ্ছে।”
“ভয় পেয়ো না। মনে সাহস রাখো।”
“ভাইজানের মুখোমুখি হলে কী হবে?”
“মাহমুদা, তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ। তোমার ভাইপো সব সামলে নিবে, দেখে নিয়ো।”
মাহমুদা মৃদু হেসে বললেন, “ওর ভরসাতেই তো এত দূর আসা।”
“এখন খাবে চলো।”
সকালের নাশতা শেষে রিকশায় করে দুজন বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন। মাহমুদার হাতে বাসের টিকেট দিয়ে আমিনুল নিবৃত্ত গলায় বললেন, “সাবধানে যেও, আর কোনো সমস্যা হলে জানিয়ো।”
“তুমি যাবে না?”
“আমি গেলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। তার থেকে তুমি একা গিয়ে ঘুরে এসো। আমি বরং এখানেই অপেক্ষা করব।”
“আমি একা যাব?”
“হ্যাঁ।”
“ঠিক আছে। তুমিও সাবধানে থেকো।”
“আচ্ছা।”
মাহমুদা বাসের মাঝামাঝি একটা সিটে বসেছেন। তাঁর দৃষ্টি জানলার বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর উদ্বিগ্ন চেহারার দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস চলতে শুরু করল। পিচঢালা রাস্তার দু’ধারে সারি সারি বনজ গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাঝ বরাবর নির্বিঘ্নে বাস চলছে। সকালবেলার মৃদু বাতাস, আকাশজুড়ে মেঘেদের ভেলা, গাছে গাছে পাখিদের কিচিরমিচির ধ্বনি আর প্রকৃতির মনোহর সুবাস হৃদয়ের কিনারা ছুঁয়ে যাচ্ছে। আধা পাকা বিস্তৃত ধান খেত পেরিয়ে মাহমুদার দৃষ্টি নদীর তীরে শুভ্রতা ছড়ানো কাশফুলে নিবিষ্ট হয়ে আছে। সহসা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে চিরসুখময় শৈশবের আহ্লাদিত স্মৃতি। বাবা-মায়ের চোখের মণি সেই সাথে তিন ভাইয়ের একমাত্র আদরের বোন ছিলেন তিনি। বড়ো দুই ভাইয়ের সীমাহীন ভালোবাসার প্রখরতা আজও অস্বীকার করার সাধ্য নেই।
গ্রীষ্মের কালবৈশাখী ঝড়ে আম কুড়ানো, মুষলধারের বৃষ্টিতে কাক ভূষণ্ডি হয়ে বাড়ি ফেরা, শরতের ভোরে বাড়ি থেকে লুকিয়ে কাশফুলের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া এসবই এখন ধুলো জমা অতীত। বাবার মৃত্যুর বছর দুয়েকের মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে শৈশবের স্মৃতিতে ঘেরা রূপলাবণ্যে পূর্ণ জন্মভূমি ছেড়ে ঢাকার মতো ব্যস্ততম কংক্রিটের নগরে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। গ্রামের মায়াডোরে বেড়ে ওঠা প্রফুল্ল জীবন প্রথমবারের মতো শহরের চার দেওয়ালের মাঝে বন্দি হয়েছিল।
গ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ভুলে শহরে টিকে থাকার লড়াইয়ে হৃদয় বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে বড়ো ভাইদের সাথে মানসিক সম্পর্কের অবনতিও ঘটেছিল। বছর কয়েক পর, নির্বোধ মস্তিষ্কে অতর্কিতে অনুভূত অদৃশ্য স্বপ্নঘোর কিংবা নির্দয় নিয়তির নিমিত্তে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের দরুন মা-ভাইদের সাথে চিরতরে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল। সেদিনের পর বাবার কেনা ভিটাতে পা পর্যন্ত রাখতে পারেননি। এক বছরের মাথায় মায়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু ভাইজানের কঠোর সিদ্ধান্তের কারণে মৃত মায়ের লাশ ছোঁয়ার অধিকারও সেদিন হারিয়েছিলেন।
ঝরাপাতার মতো ভাইদের জীবন থেকে নিঃশব্দে ঝরে গিয়েছিলেন মাহমুদা খান। অস্তিত্বের সংগ্রামে সুখ বাজি রেখে এক আকাশসম বিষাদ বুকে চেপে চিরসবুজে বেষ্টিত গ্রামের মাঝ বরাবর বিশালাকৃতির এক হাফ বিল্ডিং বাড়ি। নব্য টিনের চাল আর রঙিন দেওয়ালের চাকচিক্য দেখেই বাড়ির নতুনত্ব বোঝা যাচ্ছে। বাড়ির সামনে উঠানের এক পাশে বিস্তীর্ণ পরিসরে রান্নার আয়োজন চলছে। আত্মীয়স্বজন আর পাড়াপ্রতিবেশীদের সমাগম দেখে বিয়ে বাড়ির থেকে কম কিছু মনে হচ্ছে না। উঠান পেরিয়ে বিস্তৃত মাঠের অবস্থান। উঠানের শেষ প্রান্তে মেহগনি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন খান বাড়ির কর্তা আলী আহমদ খান। পরনে শুভ্র রঙের পাঞ্জাবি, মাথায় সফেদ টুপি।
এইমাত্র বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করে এসেছেন। নাড়ির টানে অতীতের কলহ ভুলে প্রায় ৩০ বছর পর সপরিবারে গ্রামে এসেছেন তিনি। বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে অসংখ্যবার কবরস্থানে এসেছেন ঠিকই কিন্তু কখনো বাড়ি পর্যন্ত আসেননি। বছর তিনেক আগে দেখা এক দুঃস্বপ্নে পাষাণমূর্তির ন্যায় মানবের মন বিগলিত হয়েছিল। আচমকা গ্রামে বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নেন। বছর দুয়েকের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে সফলও হয়েছেন। গতকাল বিকেলে গ্রামে এসে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে সবার সাথে দেখা করে দাওয়াত দিয়ে এসেছেন। শহরের ঝঞ্ঝাটময় প্রাত্যহিক জীবন ভুলে কিছুদিনের জন্য হলেও সন্তানরা যেন আনন্দময় জীবন উপভোগ করতে পারে তার জন্যই তাঁর এই অতিশয় আয়োজন। আলী আহমদ খান দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। মোজাম্মেল খান অধীর পায়ে এগিয়ে এসে ভাইজানের পাশে দাঁড়িয়ে স্ফূর্ত কণ্ঠে শুধালেন, “কী
ভাবছো ভাইজান?”
আলী আহমদ খান চোখ নামিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালেন। মলিন হেসে বললেন, “সুখ-দুঃখে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে।”
“কিছু মনে না করলে, একটা কথা জিগ্যেস করব?”
“হ্যাঁ।”
