
এপস্টেইন ফাইল বলতে সেই সব নথি, ডকুমেন্ট ও সাক্ষ্যসমূহকে বোঝায় যা মার্কিন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে করা যৌন পিশাচ মামলার তদন্তে সংগৃহীত হয়েছিল। এই ফাইলগুলোতে রয়েছে অভিযুক্তদের সাথে যোগাযোগের ইমেল, তার ব্যক্তিগত যোগাযোগের লিস্ট, প্লেন ফ্লাইট লগ, সাক্ষীর বিবৃতি, আদালতের কাগজপত্র এবং অন্যান্য অনুসন্ধানী নথি।
এসব নথি বহুবার সরকারী নজরে ছিল এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কংগ্রেস ও আদালতের চাপের পর কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত নথিগুলোতে কিছু পরিচিত ব্যক্তি ও তাদের সম্পর্কের তথ্য এসেছে, যদিও সবকিছুই প্রমাণ নয় এবং অনেক ডেটা চোখে অদৃশ্য বা রেড্যাক্ট করা হয়েছে। এই ফাইলগুলো জনসাধারণ ও আইনশাস্ত্রের জন্য তদন্ত ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হচ্ছে।
এপস্টেইন ফাইল এর অতীত ইতিহাস
জেফ্রি এপস্টেইন এবং তার সাথে জড়িত ফাইলগুলো নিয়ে বর্তমান বিশ্বের কৌতূহলের শেষ নেই। এটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধের গল্প নয়, বরং ক্ষমতা, রাজনীতি এবং প্রভাবশালীদের গোপন জগতের এক অন্ধকার অধ্যায়।
নিচে এই ফাইলগুলোর ইতিহাস এবং এর পেছনের মূল ঘটনাগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
জেফ্রি এপস্টেইন কে ছিলেন?
জেফ্রি এপস্টেইন ছিলেন একজন মার্কিন বিনিয়োগকারী বা ফিন্যান্সিয়ার। তিনি বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন এবং বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে তার ওঠাবসা ছিল। ২০০৮ সালে প্রথম তার বিরুদ্ধে ফ্লোরিডায় নাবালিকা পাচার এবং যৌন শোষণের অভিযোগ ওঠে। তবে রহস্যজনকভাবে তিনি তখন একটি ‘নন-প্রসিকিউশন’ চুক্তির মাধ্যমে খুব সামান্য সাজা পেয়ে বেঁচে যান।
২০১৯ সালে নিউইয়র্কে তার বিরুদ্ধে আবারও মানবপাচারের অভিযোগ আনা হয়। সেই বছরের আগস্ট মাসে জেলখানায় থাকাকালীন তার মৃত্যু হয়, যাকে অফিশিয়ালি আত্মহত্যা বলা হলেও তা নিয়ে এখনো অনেক বিতর্ক আছে।
এপস্টেইন ফাইল আসলে কী?
‘এপস্টেইন ফাইল’ বলতে সাধারণত কোনো একটি একক নথিকে বোঝায় না। এটি মূলত কয়েক হাজার পৃষ্ঠার আইনি নথিপত্র, যা ভার্জিনিয়া জুফ্রে নামক এক ভুক্তভোগীর করা মানহানির মামলা থেকে উদ্ভূত। ভার্জিনিয়া অভিযোগ করেছিলেন যে, এপস্টেইন এবং তার সহযোগী গিলেইন ম্যাক্সওয়েল তাকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করতেন।
এই ফাইলগুলোতে যা যা রয়েছে:
-
এপস্টেইনের ব্যক্তিগত ডায়েরি এবং ফোন বুক।
-
তার ব্যক্তিগত বিমানে (যাকে ‘ললিতা এক্সপ্রেস’ বলা হতো) যাতায়াতকারী যাত্রীদের তালিকা।
-
ভুক্তভোগী এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি।
-
বিভিন্ন গোপন ইমেইল এবং আইনি নথিপত্র।
কেন এই ফাইলগুলো এখন আলোচনায়?
২০২৪ সালের শুরুর দিকে মার্কিন আদালতের নির্দেশে এই ফাইলগুলোর একটি বড় অংশ জনসমক্ষে আনা হয়। এই ফাইলগুলো প্রকাশের মূল কারণ ছিল এপস্টেইনের সাথে জড়িত নামগুলো উন্মোচন করা। যদিও ফাইলে নাম থাকা মানেই কেউ অপরাধী নন, তবে এই তালিকায় অনেক বড় বড় নাম আসায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
ফাইলে থাকা প্রভাবশালী নামসমূহ
তালিকায় সরাসরি অপরাধের প্রমাণ না থাকলেও, এপস্টেইনের সাথে যোগাযোগ বা যাতায়াত ছিল এমন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে:
-
বিল ক্লিনটন: আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। যদিও তিনি দাবি করেছেন যে এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে তিনি কিছু জানতেন না।
-
প্রিন্স অ্যান্ড্রু: ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য। তার বিরুদ্ধে সরাসরি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন ভার্জিনিয়া জুফ্রে, যা পরে আদালতের বাইরে মীমাংসা করা হয়।
-
ডোনাল্ড ট্রাম্প: ট্রাম্পের নামও তালিকায় এসেছে, তবে ক্লিনটনের মতো তিনিও দাবি করেছেন যে এপস্টেইনের সাথে তার সম্পর্ক অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
-
স্টিফেন হকিং: বিখ্যাত পদার্থবিদ হকিংয়ের এপস্টেইনের দ্বীপে যাওয়ার বিষয়টি অনেককে অবাক করেছে।
- নরেন্দ্র মোদি: বর্তমানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, চা বিক্রেতা নোরেন্দ্র মোদির নামও এই নথিতে পাওয়া গেছে বলে জানা যায়, তবে এর সত্ততা জানা যায়নি।
গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের ভূমিকা
জেফ্রি এপস্টেইনের পুরো সাম্রাজ্যের মাস্টারমাইন্ড বলা হয় গিলেইন ম্যাক্সওয়েলকে। তিনি ছিলেন এপস্টেইনের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। অভিযোগ ছিল, ম্যাক্সওয়েল মূলত এপস্টেইনের জন্য অল্পবয়সী মেয়েদের সংগ্রহ করতেন এবং তাদের ট্র্যাপে ফেলতেন। ২০২১ সালে তিনি মানবপাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং বর্তমানে ২০ বছরের জেল খাটছেন। এই ফাইলগুলোর বেশিরভাগ তথ্যই তার বিচার প্রক্রিয়া থেকে সামনে এসেছে।
বর্তমান অবস্থা এবং প্রভাব
এপস্টেইন ফাইল প্রকাশের ফলে মানুষের মধ্যে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে যে, প্রভাবশালীরা আইনের উর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করেন। এখনো অনেক ফাইল সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়নি এবং অনেক নাম গোপন রাখা হয়েছে। তবে এই ঘটনাগুলো প্রকাশ পাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে শিশু পাচার এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পুরো বিষয়টি এখন কেবল একটি মামলা নয়, বরং আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি স্ক্যান্ডাল হিসেবে পরিচিত।
