
মুসলিম জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাতের মধ্যে শবে বরাতের রাত একটি। শবে বরাত নামাজের নিয়ত, শবে বরাত নামাজ কত রাকাত, কিভাবে পড়বেন ও শবে বরাত সম্পর্কে হাদিস নিয়ে আজকের আলোচনা।
বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশ মধ্য শাবান বা শবে বরাত উদযাপন করে। সালাফি আরবগণ এই দিনটি পালন করে না, তাদের মতে এইরাতে বিশেষ কোনো ইবাদাতের নির্দেশ নেই। আরব বিশ্বে, সুফি ঐতিহ্যের আরবেরা ও শিয়ারা এই উৎসব পালন করে। অন্যদিকে ইরানে বারো ইমাম শিয়ারা শিয়া মতবাদের দ্বাদশ ইমাম মাহদির জন্মদিন হিসেবে এই দিনটি পালন করে।
রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে আত্নপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করেন (ইবনু মাজাহ)।
শবে বরাত নামাজের নিয়ত
শবে বরাত নামাজের জন্য আলাদা করে নিয়ত করার প্রয়োজন নেই। আপনি স্বাভাবিক ভাবে নফল নামাজের জন্য যে নিয়ত করেন সেই নিয়ত করেই শবে বরাতের নামাজ আদায় করতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন শবে বরাতের নামাজ হলো নফল ইবাদত তাই নফল আদায় করতে গিয়ে ফরজ নামাজ ভুলে যাবেন না।
শবে বরাতের নামাজের নিয়ত বাংলা উচ্চারণ:
নাওয়াইতুআন্ উছল্লিয়া লিল্লা-হি তাআ-লা- রাকআতাই ছালা-তি লাইলাতিল বারা-তিন্ -নাফলি, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা-জিহাতিল্ কাবাতিশ্ শারীফাতি আল্লা-হু আকবার।
বাংলায় নিয়ত করলে এই ভাবে করতে পারেন: ‘শবে বরাতের দুই রাকাত নফল নামাজ/ সালাত কিবলামুখী হয়ে পড়ছি, আল্লাহু আকবর’।
শবে বরাত নামাজ পড়ার নিয়ম
শবে বরাতের নামাজ পড়ার বিশেষ কোনো নিয়ম না থাকলেও আপনি এভাবে পড়তে পারেন। একসাথে ৪ রাকাতের বদলে ২ রাকাত করে নামাজ আদায় করুন। শুধু নামাজ না পরে সাথে অন্যান্য নফল ইবাদত যেমন কুরআন তেলাওয়াত, তসবি পাঠ করুন।
অতিরিক্ত নফল আদায় করতে গিয়ে সকালের ফজরের নামাজ ভুলে যাবেন না, নফল ইবাদতের থেকে ফরজ ইবাদত গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক ভাবে নামাজ আদায় করার তৌফিক দান করুন।
শবে বরাত সম্পর্কে হাদিস ও ফজিলত
বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্নিত আছে, মুহাম্মাদ (সঃ) এ মাসে বেশি বেশি নফল রোযা পালন করতেন। শাবান মাসের রোযা ছিল তার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এমাসের প্রথম থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত এবং কখনো কখনো প্রায় পুরো শাবান মাসই তিনি নফল সিয়াম পালন করতেন। নবি মুহাম্মাদ (সঃ) বলেন,
হাদিস-১
“এ মাসে রাব্বুল আলামীনের কাছে মানুষের কর্ম উঠানো হয়। আর আমি ভালবাসি যে, আমার রোযা রাখা অবস্থায় আমার আমল উঠানো হোক।”
(নাসাঈ, আস-সুনান ৪/২০১; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/২৪৭)।
হাদিস-২
আলী ইবনে আবী তালেব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে সালাত আদায় করবে আর দিবসে সিয়াম পালন করবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বলেন : আছে কি কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোন রিয্ক প্রার্থনাকারী আমি রিয্ক দান করব। আছে কি কোন বিপদে নিপতিত ব্যক্তি আমি তাকে সুস্থ্যতা দান করব। এভাবে ফজর পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে। (ইবনে মাজাহ ও বাইহাকী)
আবূ হুরাইরা বর্ণিত বুখারী ও মুসলিমের হাদীসের বক্তব্য হল আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ অংশে দুনিয়ার আকাশে আসেন। আর প্রতি রাতের মধ্যে শাবান মাসের পনের তারিখের রাতও অন্তর্ভুক্ত। অতএব এ হাদীস মতে অন্যান্য রাতের মত শাবান মাসের পনের তারিখের রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ পৃথিবীর আকাশে আসেন।
তাকি উসমানি বলেন, “এ কথা বলা একেবারেই ভুল যে, শবেবরাত কোন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং আসল সত্য হল, ১০ জন সাহাবি থেকে এই হাদিস বর্ণিত আছে। যে হাদিসগুলোয় নবী করীম (সা.) এই রাতের ফজিলত বর্ণনা করেছেন। সেই হাদিসগুলোর মধ্যে কিছু হাদিস সনদের দিক থেকে যদিও কিছুটা দূর্বল। যার কারণে কয়েকজন আলেম বলেছেন এই রাতের ফজিলতের কথা ভিত্তিহীন। কিন্তু এর স্বপক্ষে অন্য অনেক হাদিস পাওয়া যায়। যার মাধ্যমে সেগুলোর দূর্বলতা দূর হয়ে যায়।
শবে বরাতের বিশেষ দোয়া
রমজানের দুই মাস আগ থেকেই রাসুল (স.) একটি দোয়া বেশি বেশি পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই দোয়াটি আমরা পুরো রজব-শাবানে পড়তে পারি। দোয়াটি হলো— اَللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِىْ رَجَبَ وَ شَعْبَانَ وَ بَلِّغْنَا رَمَضَانَ (অর্থ) ‘হে আল্লাহ, আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দিন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রজব মাস শুরু হলে রাসুল (স.) এই দোয়া পাঠ করতেন। (বায়হাকি: ৩৫৩৪; নাসায়ি: ৬৫৯; মুসনাদে আহমদ: ২৩৪৬)
শবে বরাত নামাজ কত রাকাত?
শবে বরাতের নামাজ কত রাকাত এর নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা কোথাও কোনো হাদিসে উল্লেখ নেই তাই আপনি চাইলে ২ রাকাত করে ইচ্ছা অনুযায়ী নফল নামাজ পড়তে পারবেন।
শবে বরাতের রোজা কয়টি?
শবে বরাতের রোজা বলতে রাসুল (সাঃ) তার সাহাবিদের এই মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতে বলেছেন। সর্বনিম্ন ২টি রোজা রাখার জন্য বলেছেন, কারণ ইহুদীরা শবে বরাতে ১টি রোজা রাখে।
