বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস ১২০৪-১৭৫৭ | 2026

আজকের এই স্বাধীন বাংলা একসময় অন্য দেশের মানুষ শাসন করত। বাংলায় প্রথমে মুসলিমরা শাসন করত। বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস আনুমানিক প্রায় ১২০৪-১৭৫৭ অব্দ পর্যন্ত টিকে ছিলো। অষ্টম শতকের শুরু থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন টিকে ছিলো ৷ ভারতে মুসলিম শাসন প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন মুহম্মদ ঘুরী ।

বাংলায় প্রথম মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি (১২০৪- ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে)। এর পর মুঘলরা বাংলা দখলে নিলে তারা শাসন শুরু করে। হাজার বছরের ইতিহাসে বাংলারিরা বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন শাসকের দ্বারা শাসিত হয়েছে। আজকের আমাদের এই পোস্ট থেকে আমারা বাংলার এই শাসনের ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারব।

বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস ১২০৪-১৭৫৭

বাংলার ইতিহাস মুসলিম শাসনের সূচনা হয় ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির নদীয়া বিজয়ের মাধ্যমে। এরপর দীর্ঘ ৫৫৩ বছর এ ভূখণ্ড ছিল মুসলিম শাসনাধীনে। এর শেষ পর্বে ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়, যা ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি পর্যন্ত ১৯০ বছর স্থায়ী ছিল। সব মিলিয়ে ৮১৬ বছরের ইতিহাসে ৬২৬ বছর বাংলা ছিল মুসলিম শাসনাধীন। বাকি সময় দিল্লি ও ইসলামাবাদ কেন্দ্রিক রাজশক্তির অধীনে বাংলা শাসিত হয়েছিলো।

বাংলায় মুসলিম শাসনামলের ধারাবাহিকতা

ইখতিয়ার খিলজির বিজয়ের সময় দিল্লিতে রাজত্ব করছিলেন মোহাম্মদ ঘোরীর বংশধরগণ, আর নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাসনামলে মুঘল সম্রাট ছিলেন আলমগীর শাহ। তবে ভারতের শেষ মুঘল সম্রাট ছিলেন বাহাদুর শাহ জাফর (১৮৩৭–১৮৫৭)। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতবর্ষ থেকে মুঘল শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। তার আগে বাংলায় পাল ও বৌদ্ধ রাজাদের পর হেমন্ত সেন ১০৭০ সালে সেন বংশের হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কর্ণাটকের এই ব্রাহ্মণ বংশ সংস্কৃতকে রাজভাষা হিসেবে গ্রহণ করে। সেনদের পতন ঘটে বখতিয়ার খিলজির হাতে। তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে মুসলিম শাসনের যাত্রা শুরু হয়।

আরও পড়ুন  অনার্স উপবৃত্তি সংক্রান্ত নোটিশ ২০২৫ নতুন আবেদন করুন

মুসলিম শাসনের ধারাবাহিক রাজবংশসমূহ

১২০৪ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত বাংলার মুসলিম শাসনে বিভিন্ন রাজবংশ ও শাসকগণ ছিলেন:

১. বখতিয়ার খিলজি রাজবংশ (১২০৪–১২২৭)
২. মামলুক সুলতানগণ (১২২৭–১২৮১)
৩. বলবান আমল (১২৮১–১৩২৪)
৪. তুঘলক শাসন (১৩২৪–১৩৩৯)
৫. ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ বংশ (১৩৩৯–১৩৫২)
৬. ইলিয়াস শাহ বংশ (১৩৫২–১৪৮৭)
৭. হাবশী শাসনামল (১৪৮৭–১৪৯৪)
৮. মুঘল সুবেদার ও গভর্নরগণ (১৫৬৫–১৭১৭)
৯. স্বাধীন নবাবগণ (১৭১৭–১৭৫৭)

মুর্শিদ কুলি খান ১৭১৭ সালে দিল্লির মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের অধীনে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত হন, পরে তিনি মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপন করে স্বাধীন নবাবি শাসনের সূচনা করেন। তার শাসনকাল ছিল ১৭১৭–১৭২৭। এরপর তার উত্তরসূরি ছিলেন:

১. সরফরাজ খান (১৭২৭)

২. সুজা উদ-দৌলাহ (১৭২৭–১৭৩৯)

৩. নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০–১৭৫৬)

৪. নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৭৫৬–১৭৫৭)

বখতিয়ার খিলজি ও সমালোচনা

বখতিয়ার খিলজির নদীয়া দখল রক্তপাতহীন হলেও, অনেকেই তাকে মিথ্যা অভিযোগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের জন্য দায়ী করেন। অথচ ঐতিহাসিক প্রমাণ অনুযায়ী সোমপুর (পাহাড়পুর) বিহার ধ্বংস করেন বিষ্ণুভক্ত হিন্দু রাজা জাতবর্মা এবং শালবন বিহার ধ্বংস করেন হিন্দু ব্রাহ্মণগণ। বৌদ্ধ পাল রাজত্বের পতন ঘটে সেন রাজাদের হাতে। এই অত্যাচারে বহু বৌদ্ধ প্রাণ বাঁচাতে নেপাল, তিব্বত, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় পালিয়ে যান। তখনই চর্যাপদের বিস্তার ঘটে ওই অঞ্চলে। অনেক বৌদ্ধই পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে বাঙালি মুসলিম সমাজে একীভূত হন।

মুসলিম শাসনের গ্রহণযোগ্যতা

মুসলিম শাসকদের উদার নীতিমালা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও প্রজাহিতৈষী দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছিল। উপকূলীয় অঞ্চলে পর্তুগিজ জলদস্যু, হিন্দু মারাঠা বর্গী এবং বার্মিজ মগদের আক্রমণের বিরুদ্ধে মুসলিম সুলতান ও নবাবরা ছিলেন আপোষহীন রক্ষাকর্তা। এসব কারণে বাংলায় ইসলাম গ্রহণ এক প্রাকৃতিক সামাজিক রূপান্তর হিসেবেই বিবেচিত।

আরাকান ও বাংলার সম্পর্ক

আরাকান, বার্মা ও বাংলার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ১৪০৬ সালে আরাকানের রাজা নরমিখলা বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে ১৪৩০ সালে বাংলার ৩০,০০০ সেনার সহায়তায় আরাকানের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেন। এই মারাউকি আমল প্রায় ৩৫৫ বছর স্থায়ী হয় (১৪৩০–১৭৮৫)। আরাকানের রাজসভায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা এবং মুসলিম প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। ‘আকিয়াব’, ‘রোহিঙ্গা’, ‘আরাকান’ শব্দগুলোর শিকড়ও আরবি ও ইসলামি ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।

আরও পড়ুন  HSC পদার্থ বিজ্ঞান ১ম পত্র সাজেশন 2026

নবাব সিরাজউদ্দৌলা এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস

নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নবাব আলীবর্দী খানের নাতি। দেশপ্রেমিক, বিচক্ষণ ও সাহসী এই তরুণ নবাবের প্রতিপক্ষ ছিলেন নিজের খালা ঘসেটি বেগম, সেনাপতি মীর জাফর, এবং জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ, রায় দুর্লভদের মতো চক্রান্তকারী অভিজাতরা। তার পাশে ছিলেন মা আমেনা বেগম, স্ত্রী লুৎফুননেছা, মীর মদন ও মোহনলালের মতো বিশ্বস্ত সহচর। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার ফলে তিনি পরাজিত হন। তার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে কেবল বাংলার স্বাধীনতার অবসান নয়, বরং সমগ্র উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পতন সূচিত হয়।

ইংরেজ শাসনের শোষণ ও মুসলিম সমাজের অবনতি

১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭। এই ১৯০ বছর ইংরেজ শাসনে মুসলমানদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে দেওয়া হয়। ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিতে তারা ধর্ম ও জাতিভেদকে উসকে দিয়ে শাসনব্যবস্থা চালু রাখে। মুসলিমদের জমি কেড়ে হিন্দু মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। নীলচাষ, জমিদারি নিপীড়ন ও শিক্ষাগত বঞ্চনায় মুসলিমরা চরম দুরবস্থায় পড়ে। এই সময় মুসলমানদের কাছ থেকে ধনসম্পদ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া হয় পরিকল্পিতভাবে।

বাংলার ইতিহাস বিচিত্র, রক্তস্নাত, আবার গৌরবময়ও বটে। এই ইতিহাসে রয়েছে ধর্ম, সংস্কৃতি, শাসন, বিদ্রোহ, স্বাধীনতা এবং বাঙালিত্বের উত্থান। বখতিয়ার খিলজির বিজয় থেকে শুরু করে সিরাজউদ্দৌলাহর সংগ্রাম, তারপর ইংরেজ শাসনের অন্ধকার সময় পেরিয়ে ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এই ধারাবাহিকতায় এক ঐতিহাসিক আত্মপরিচয় নির্মিত হয়েছে। আর সেই পরিচয়ই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি।

বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস ১২০৪-১৭৫৭ pdf

We will be happy to hear your thoughts

Leave a reply

Amar Sikkha
Logo