
নিতুর মাহবুব ভাই পর্ব ৮ দেখায় যে নিতু এখন কেবল মাহবুবের বিরোধিতা করছে না, বরং তাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং মানসিকভাবে পরাজিত করছে।
নিতুর মাহবুব ভাই পর্ব ৮
রাতে গানের অনুষ্ঠানে নিতু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাস্ক মুখে বেশ উৎসাহী হয়ে বসলো। সবাই গানের জন্য রিকোয়েস্ট করতেই বললো,
—যারা বিশেষভাবে আমার গান শুনতে আগ্রহী তাদের জন্য আমি একটু কষ্ট করতেই পারি। তবে গান হবে হবে খালি গলায়।
—সে কি রে এত বাদ্যযন্ত্রের মাঝে, এমনি গান!
—আমি সাধারণ গাই, এই বড় বড় ইনস্ট্রুমেন্টসের সাথে কখনোই গাইনি।
মাহবুব ভাই ড্রামকে লাথি মেরে উল্টে ফেলে দিলেন।
নিতু তাঁর তোয়াক্কাই করলো না।
সে লম্বা টান ধরলো,
অন্তরে বিষ ঢালে বাঁশি শুধু, পোড়ায় ও প্রাণ গড়লে,
চোরা দিন দুপুরে চুরি করে রাত্তিরে তো কথা নাই…
এবং গানটা
খুব ভালোভাবেই গাইলো।
গান শেষে মাহবুব ভাই কিছু বলবেন বলে পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছিলেন। নিতু তার আগেই উঠে বললো,
—আমি যাই। হট্টগোলে থেকে মাথা ধরে গেছে। পলু অায়, আমার সাথে বসবি চল। কাঁচকলা আর তেতুল দিয়ে ভর্তা করবো। ধনেপাতা কুচি করে কেটে দিবি আয়!
পলাশ মহানন্দে উঠে এলো। পলাশের সাথে মুকুল, এলো। নীলু এলো। এমনি করে প্রায় পাঁচ-ছয়জনের একটা গ্রুপ নিতুর সাথে উঠে চলে এলো।
এক পর্যায়ে দেখা গেলো, মাহবুব ভাইয়ের গানের আসর ছেড়ে নিতুর ভর্তার আসরে সবাই চলে এসেছে। নিতু সবাইকে নিয়ে সেই আসরে গোল হয়ে বসলো। আসরের মধ্যমণি সে। কত রাজ্যের যে আলোচনা। গল্পের এক ফাঁকে নিতুর মনে হলো, মাহবুব ভাইয়ের খপ্পরে পরে তাঁর ভেতরের নিতুটা যে কত স্পেশাল এতদিনতো তা জানাই হয়নি।
বিয়ের দিনে সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিতু নীল আর ধবধবে সাদার কম্বিনেশনের লেহেঙ্গা পরলো। দু-হাত ভর্তি নীল-সাদা মেশানো স্টিলের চুরি। কানে সাদা মুক্তোর লম্বা দুল। গলায় সাদা আর নীল পুতির ভারী মালা। চোখে নীল সানগ্লাস। কপালে সাদা পাথরের টিকলি। । ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক।
বিয়ের ফাংশানের এক ফাঁকে মাহবুব ভাইকে দেখা গেলো, নীল পাঞ্জাবি পরেছেন।
খাবারের সময় নিতুর সাথে দেখা হতেই, তিনি চোখ কপালে তুলে বললেন,
—তুই নীল পরলি যে, ওহো.. আমাকে ফলো করে।
নিতু প্রথমে কথাটা না শোনার ভান করলো।
মাহবুব ভাই আবার বললেন,
—নীলের সাথে সাদা কোন বুদ্ধিতে পরলি? মনে হচ্ছে সাদা আর্ট পেপারে হাতের ধাক্কা লেগে একটা নীল রংয়ের ডিব্বা উল্টে পরে গেছে।
নিতু মাহবুব ভাইয়ের দিকে তাঁকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। তারপর আরো মিষ্টি করে বললো,
—ইশ্! সেরকম মনে হচ্ছে নাকি?
মাহবুব ভাই একটু চমকে গেলেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
—একটু খেয়াল করবি না? কিসের সাথে কি ম্যাচিং হয়! কনটেম্পোরারি কালারগুলো আমি আবার ভালো বুঝি। তোর তো মাথার পুরোটাই ফাঁকা।
—এরপর থেকে কিছু পরলে আপনাকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবো মাহবুব ভাই । সাজেশন দিয়ে দেবেন। এখন আপনি কি দয়া করে অন্য টেবিলে খেতে বসবেন? আপনি এখানে বসলে আমি অন্য টেবিলে বসবো।
মাহবুব ভাইয়ের মুখটা বড় হা হয়ে এলো।
—এক টেবিলে বসলে সমস্যা কি?
—আপনি সিনিয়র মানুষ, তাছাড়া একটা নীল রং ঘেটে যাওয়া আর্ট পেপার আপনার সাথে বসে ভাত খাচ্ছে এটা দেখে যদি আপনার খাওয়ার সমস্যা হয়…
ওকে ফাইন, আমিই যাচ্ছি।
নিতু নরম করে হেসে উঠে এলো। নিতুর সাথে সাথে পলু আর বকুলও উঠে এলো।
নিতু জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে বিশাল এক খিলি পান মুখে পুড়ে যখন পুকুর ঘাটের সিড়িতে বসেছে, অমনি মাহবুব ভাই হাজির!
—তুই পান খাচ্ছিস?
নিতু মাথা নেড়ে হাসলো।
—পান খাচ্ছিস?
—ইয়েস।
মাহবুব ভাই গলার স্বর পঞ্চমে তুলে বললেন,
—পান খাবার মত এত দুঃসাহস তোর হয় কি করে?
ফাজিল। পান ফেল, এক্ষুণি ফেল। মারবো এক চড়।
নিতু উঠে দাঁড়ালো, শব্দ করে পানের পিচকি ফেললো। আঙুলের মাথা থেকে একটু চুন মুখে নিয়ে মাহবুব ভাইয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো।
হাসিমুখ করে মধুর স্বরে বললো,
—মাহবুব ভাই আপনি কি জানেন? আপনি যখন এরকম চেঁচিয়ে কথা বলেন, আপনাকে তখন দেখতে প্রসব বেদনায় ছটফট করা কালো বিড়ালের মত দেখায়। যে বিড়ালের দুটো বাচ্চা হয়ে আরেকটি দরজায় আটকে আছে; একদম সেরকম।
আরেকটা ব্যাপার, ইদানীং আমি লক্ষ্য করে দেখেছি আপনার আচার আচরণ অসুখ করে লোম ঝরে যাওয়া রাস্তার সেই প্রাণীটার মতো। প্রাণীটার নাম আমি এই মুহূর্তে মুখে আনছি না কারণ আপনি আমার বড়। আফটার অল আমি বড়দের সম্মান করতে জানি। এটা আমি খুব মানিও। তাও বেয়াদবি নেবেন না প্লিজ। আমার মনে হলো আপনাকে একটু ওয়ার্ন করা দরকার। তাই বললাম।
মাহবুব ভাই হাঁ করে তাঁকিয়ে আছেন।
নিতু দুটো সিঁড়ি লাফ দিয়ে উঠে আবার পানের পিক ফেললো।
ঘুরে তাঁকিয়ে বললো,
—আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে, আমি সরি মাহবুব ভাই। আরেকটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট, আমার ব্যাপারে কনসার্ন না দেখালে ভালো হয়। ইট ইরিটেইটস মি! আমার কেনো জানি মনে হয় আপনি আমার ভালো চান না। আপনি আমার নাম ধরে ডাকলে অশান্তি হয় খুব। আপনি বুঝতে পারছেন তো, আমি কি বলতে চাইছি। আমি সাধ্যমত ভদ্রভাবে বললাম, এরপর বোধহয় আর এভাবে বলতে পারবো না। সরি।
কথাগুলো বলে নিতু সিঁড়িগুলো লাফিয়ে বেয়ে উপরে চলে এলো।
পেছনে তাঁকালে সে ঠিক দেখতো মাহবুব ভাই মাথা ঘুরে পুকুরে পড়ে গেছেন।
বৌভাতের দিন
লীনা’পুর শশুড়বাড়ি যাবার সময় নিতু যখনি গাড়িতে বসতে গেলো, শুনলো এর সামনের সিট মাহবুব ভাইয়ের।
নিতু প্রথমে খুব স্বাভাবিক ভাবেই গাড়িতে বসলো। তারপর হুট করে বললো,
—গরম লাগছে বেশি। আমি অন্য গাড়িতে যাবো।
নিতু নেমে এলো এবং অন্য গাড়িতে উঠতে যাবে তখন মাহবুব ভাই রক্তচক্ষু করে ছুটে এলেন।
—তুই গাড়ি থেকে নেমে এলি কেনো?
তুই একজন নামায় কত গোলমাল বেঁধেছে জানিস! অামি হিসেব করে লোক বসিয়েছি। নেমে এলি কেনো? হুঃ! এত সাহস বেড়েছে কেনো তোর?
—আমার জন্য গোলমাল বাঁধলে দরকার পরলে অামি যাবো না। আপনি এত হাইপার কেনো হচ্ছেন মাহবুব ভাই? একটা সামান্য সিট ই তো। আপনার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীব্যাপি ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প হচ্ছে। এই যে অামি সিট ছেড়ে দিলাম। হ্যাপি?
মাহবুব ভাই গাড়িতে রাখা পানির বোতলটা নিতুর মাথায় ঢেলে দিলেন।
বড় খালা ছুটে এলেন
—-কিরে নিতু, কি হয়েছে?
নিতু ঠান্ডা স্বরে বললো,
—আমি ওই গাড়ি থেকে নেমে এসেছি বলে মাহবুব ভাই আমার মাথায় পানি ঢেলে দিয়েছেন। গতকাল তিনি…
মাহবুব ভাই চেঁচিয়ে বললেন,
—আমি ইচ্ছে করে ঢালিনি ফুপি। নিতু বসতে গেলো, ক্যাপটা খোলা ছিলো, নিতুর মাথায় পরে গেলো। দাঁড়া নিতু, আমি এক্ষুণি টাওয়েল নিয়ে আসছি।
—প্লিজ। আপনি টাওয়েল আনবেন না। আমি চেইঞ্জ করতে এমনিতেও ভেতরে যাবো। বৌভাত ক্যানসেল হলো, ব্যাপার না। থাক।
মাহবুব ভাই ঘোষণা দিলেন তিনি বৌভাতে যাচ্ছেন না। তাঁর মাথা ব্যাথা।
তার কিছুক্ষণ পরই দেখা গেলো, নিতু দারুণ করে সেজেগুজে এসে গাড়িতে বসলো। নিতু যেই গাড়িতে বসলো, মাহবুব ভাই কিল মেরে গাড়ির জানলার একটা কাঁচ ফাটিয়ে দিলেন।
যেনো কিছুই হয়নি, নিতু এমনভাবে বললো,
—যাক এবার পেছনের সিটেও বাতাস লাগবে।
