এতেকাফ কি, এতেকাফ করার নিয়ম ও ফজিলত 2026

এতেকাফ আরবী শব্দ যার অর্থ হল, অবস্থান করা, অভিমুখী হওয়া, নিবেদিত হওয়া, নিরবচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি। এতেকাফ হলো আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততাকে গুটিয়ে, এমন মসজিদে অবস্থান করা, যেখানে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা হয়।

দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততাকে পাশে ঠেলে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে, আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থানের এই যে বিধান- নিঃসন্দেহে তা বান্দার প্রতি রাব্বুল আলামীনের অনেক বড় ইহসান। বান্দার উচিত এই মহান বিধানের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং আবেগ ও মহব্বতের সাথে এই আমলের প্রতি উৎসাহী হওয়া।

ইসলামে এতেকাফ ৩ প্রকার 

১. সুন্নাত এতেকাফ : রমজানের শেষ দশকের এতেকাফ। অর্থাৎ ২০ রমজানের সূর্য ডোবার আগ মুহূর্ত থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত মসজিদে এতেকাফ করা। এ ধরনের ইতিকাফকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া বলা হয়। গ্রাম বা মহল্লাবাসীর পক্ষে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তি এই ইতিকাফ করলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে।

২. ওয়াজিব এতেকাফ : নজর বা মানতের এতেকাফ ওয়াজিব। যেমন কেউ বলল যে, আমার অমুক কাজ সমাধা হলে আমি এত দিন এতেকাফ করব অথবা কোনো কাজের শর্ত উল্লেখ না করেই বলল, আমি এত দিন অবশ্যই এতেকাফ করব।

৩. নফল এতেকাফ : সাধারণভাবে যেকোনো সময় এতেকাফ করা নফল। এর কোনো দিন কিংবা সময়ের পরিমাপ নেই। অল্প সময়ের জন্যও এতেকাফ করা যেতে পারে। এ জন্য মসজিদে প্রবেশের আগে ইতিকাফের নিয়ত করে প্রবেশ করা ভালো।

এতেকাফ করার নিয়ম

১. নিয়ত করা:

নিয়ত ছাড়া সারাজীবন মসজিদে অবস্থান করলেও এতেকাফ হবে না।

প্রত্যেক ইবাদাতের জন্য নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত মানে হচ্ছে মনের সংকল্প। আর তার স্থান হল অন্তর; মুখ নয়। রাসূলুল্লাহ (স.) ও তার সাহাবীদের কেউই কোন নির্দিষ্ট শব্দ মুখে উচ্চারণ করতেন না। যেকোন ইবাদাতের জন্য মনে মনে সংকল্প করলেই নিয়ত হয়ে যাবে; মুখে কিছু উচ্চারণের প্রয়োজন নেই।

আরও পড়ুন  ভোট দেওয়ার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ কারণ ও শরয়ী বিধান

২. এতেকাফ মসজিদে হতে হবে:

যেহেতু আল্লাহ তায়ালা এতেকাফের সাথে মসজিদের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর মসজিদে এতেকাফরত অবস্থায় তোমরা স্ত্রীর নিকট গমন করো না। (সুরা বাকারা; ১৮৭)

মসজিদের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম স্থান

ক. এতেকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো, মসজিদে হারাম।

খ. এরপর মসজিদে নববি।

গ. এরপর বায়তুল মুকাদ্দাস।

ঘ. তারপর জামে মসজিদ।

ঙ. মহিলাদের যদি মসজিদে এতেকাফের সুযোগ হয়, এবং পরিবেশ সার্পোট করে, তাহলে তারা মসজিদে করবে। আর যদি ফেতনার আশংকা থাকে তাহলে মহিলারা নিজ গৃহের এক কোণায় নামাজের স্থানে এতেকাফ করতে পারবেন।

বি:দ্র: বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে এতেকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি নিতে হবে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া এতেকাফ শুদ্ধ হবে না।

৩। পবিত্রতা: এতেকাফকারীকে (বীর্যপাত, মাসিক বা নেফাস-জনিত কারণে ঘটিত) বড় নাপাকি থেকে পবিত্র থাকতে হবে।

৪। মুসলিম হওয়া শর্ত: কেননা এ বিধান অমুসলিমের জন্য প্রযোজ্য নয়।

এতেকাফকারীর জন্য যা করা বৈধ

১। অতি প্রয়োজনীয় ব্যাপারে এতেকাফকারী মসজিদ থেকে বের হতে পারে। যেমন পানাহার করতে, পরনের কাপড় আনতে এবং পেশাব পায়খানা করতে বের হওয়া বৈধ। তদনুরূপ শরয়ী প্রয়োজনে; যেমন নাপাকীর গোসল করতে অথবা ওযু করতে মসজিদের বাইরে যাওয়া বৈধ।

আয়েশা (রা) বলেন, (এতেকাফের সময়) রাসূলুল্লাহ (র.) ব্যক্তিগত প্রয়োজন ছাড়া ঘরে আসতেন না।

তিনি আরো বলেন, এতেকাফকারীর জন্য সুন্নত হল, সে কোন রোগীকে দেখতে যাবে না, কোন জানাযায় অংশগ্রহণ করবে না, স্ত্রী সহবাস করবে না, আর অতি প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হবে না।

(আদাবুল মুফরাদ ২১৬০)

২। মসজিদের ভিতরে এতেকাফকারী পানাহার করতে ও ঘুমাতে পারে। তবে মসজিদের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার খেয়াল অবশ্যই রাখতে হবে। নিজের অথবা অন্যের প্রয়োজনে বৈধ কথা বলতে পারে।

৩। মাথা আঁচড়ানো, লম্বা নখ কাটা, দৈহিক পরিচ্ছন্নতার খেয়াল রাখা, সুন্দর পোশাক পরা, আতর ব্যবহার করা ইত্যাদি কর্ম এতেকাফকারীর জন্য বৈধ।

আরও পড়ুন  আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার উপায় জেনে নিন | ২০২৬

মহানবী (স.) এতেকাফ অবস্থায় নিজের মাথাকে মসজিদ থেকে বের করে হুজরায় আয়েশার সামনে ঝুঁকিয়ে দিতেন এবং তিনি মাসিক অবস্থাতেও তার মাথা ধুয়ে দিতেন এবং আঁচড়ে দিতেন।

(বুখারী ২০২৮, ২০৩০, মুসলিম ২৯৭)

৪। এতেকাফ অবস্থায় যদি পরিবারের কেউ এতেকাফকারীর সাথে মসজিদে দেখা করতে আসে, তাহলে তাকে এগিয়ে বিদায় দেওয়ার জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া বৈধ। হযরত সাফিয়্যাহ মহানবী (স.) এর সাথে দেখা করতে এলে তিনি এরূপ করেছিলেন। (বুখারী ২০৩৫, মুসলিম ২১৭৫)

এতেকাফের উদ্দেশ্য ও ফজিলত 

এতেকাফের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে লাইলাতুল কদর প্রাপ্তির মাধ্যমে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভ। এতেকাফের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইবনুল কাইয়্যেম বলেছেন, ‘আল্লাহর প্রতি মন নিবিষ্ট করা, তাঁর সাথে নির্জনে বাস করা এবং স্রষ্টার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি থেকে দূরে অবস্থান করা, যাতে তার চিন্তা ও ভালোবাসা মনে স্থান করে নিতে পারে।’

ইতিকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদর লাভ করার সম্ভাবনাও অনেক বেশি থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদর লাভের আশায় একবার রমযানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করেন। এরপর কয়েকবার ইতিকাফ করেন মাঝের দশ দিন। এরপর একসময় শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতে শুরু করেন এবং ইরশাদ করেন-

تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ.

তোমরা রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। [সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২০]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর এভাবে ইতিকাফ করার পর যখন রমযানের ২১তম রাত এল… তিনি ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছে সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। কারণ আমাকে শবে কদর সম্পর্কে অবগত করা হয়েছিল (যে তা শেষ দশকের অমুক রাত।) এরপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। … সুতরাং তোমরা শেষ দশকে শবে কদর অন্বেষণ কর এবং প্রতি বেজোড় রাতে অন্বেষণ কর। [সহীহ বুখারী হাদীস ২০২৭]

We will be happy to hear your thoughts

Leave a reply

Amar Sikkha
Logo