
সমাস চেনার সহজ উপায় জানার আগে জেনে নেওয়া দরকার সমাস কাকে বলে কত প্রকার ও কী কী, সমাস শব্দের অর্থ হচ্ছে সংক্ষেপণ বা ছোট করা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহের মতে, “পরস্পর অর্থ সঙ্গতি বিশিষ্ট দুই বা বহুপদকে একটি পদ করার নাম সমাস।”
ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “অর্থের দিক দিয়া পরস্পরের মধ্যে সম্বন্ধ আছে এরূপ দুই (বা তাহার অধিক) পদ মিলিত হইয়া একপদে পরিণত হইলে ব্যাকরণে সেই মিলনকে বলা হয় সমাস।” প্রধানত বাংলা ব্যাকরণে সমাস ছয় প্রকার: দ্বন্দ্ব, দ্বিগু, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি ও অব্যয়ীভাব সমাস। ছাড়া আরো কিছু অপ্রধান সমাসও আছে: প্রাদি, নিত্য, অলুক, উপপদ ইত্যাদি।
সমাস চেনার সহজ উপায় সমূহ
দ্বন্দ্ব সমাস
দ্বন্দ্ব সমাস নয় প্রকার:
১। সমার্থক দ্বন্দ্ব: কাজ ও কর্ম = কাজ-কর্ম, হাট-বাজার, ঘর-দুয়ার, কল-কারখানা, খাতা-পত্র
২। বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব: দিন ও রাত = দিন-রাত, জমা-খরচ, ছোট-বড়, ছেলে-বুড়ো, লাভ-লোকসান
৩। বিকল্পর্থক দ্বন্দ্ব: হার অথবা জিৎ = হার-জিৎ
৪। সমাহার দ্বন্দ্ব: দুধ ও কলা = দুধ-কলা
৫। মিলনার্থক দ্বন্দ্ব: চাল ও ডাল = চাল-ডাল, মা-বাপ, মাসি-পিসি, জ্বিন-পরি, চা-বিস্কুট
৬। অলুক দ্বন্দ্ব: কাগজে ও কলমে = কাগজে-কলমে
৭। বহুপদী দ্বন্দ্ব: রূপ, রস, গন্ধ ও স্পর্শ = রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ
৮। একশেষ দ্বন্দ্ব: তুমি, সে ও আমি = আমরা
৯। অনুকার দ্বন্দ্ব: কাজ ও টাজ= কাজটাজ
কর্মধারয় সমাস
বিশেষ্যের সাথে বিশেষণের সমাসকে কর্মধারয় সমাস বলে। যথা: নীল যে উৎপল = নীলোৎপল। কর্মধারয় সমাসে উত্তর পদের অর্থ প্রধান হয়।
কর্মধারয় সমাস প্রধানত পাঁচ প্রকার। যথা:
(১) সাধারণ কর্মধারায় সমাস
বিশেষণ ও বিশেষ্য, বিশেষ্য ও বিশেষ্য অথবা বিশেষণ ও বিশেষণ পদের মধ্যে এই সমাস হয়ে থাকে। যেমন, নীল যে আকাশ = নীলাকাশ।
- (২) মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
কর্মধারয় সমাসে কোন কোন স্থানে মধ্যপদের লোপ হয়। সেজন্যেই একে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে। যথা: গাড়ি রাখবার বারান্দা = গাড়িবারান্দা। এখানে ‘রাখবার’ মধ্যপদের লোপ হয়েছে।
- (৩) উপমিত কর্মধারয় সমাস
সমান ধর্মবাচক পদের প্রয়োগ না থাকলে উপমেয় ও উপমান পদের যে সমাস হয়, তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: মুখ চন্দ্রসদৃশ = মুখচন্দ্র।
- (৪) রূপক কর্মধারয় সমাস
উপমেয় পদে উপমানের আরোপ করে যে সমাস হয়, তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে। এতে উপমেয় পদে রূপ শব্দের যোগ থাকে। যেমন: বিদ্যারূপ ধন = বিদ্যাধন। এখানে ‘রূপ’ শব্দের যোগ রয়েছে।
- (৫) উপমান কর্মধারয় সমাস
উপমানবাচক পদের সাথে সমান ধর্মবাচক পদের মিলনে যে সমাস হয়, তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: শশের (খরগোশের) ন্যায় ব্যস্ত = শশব্যস্ত।
তৎপুরুষ সমাস
দ্বিতীয়াদি বিভক্ত্যন্ত পদ পূর্বে থেকে যে সমাস হয়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। এতে উত্তরপদের অর্থ প্রাধান্য থাকে। যেমনঃ লবণ দ্বারা যুক্ত = লবণাক্ত।
“‘তৎপুরুষ”‘ শব্দটির অর্থ হল “তার পুরুষ”। তার পুরুষ এই শব্দ গুলির একপদীকরণে তৎপুরুষ শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। এখানে পূর্ব পদ থেকে সম্বন্ধ পদের বিভক্তি ‘র’ লোপ পেয়েছে ও উত্তর পদের অর্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। এইভাবে এই সমাসের অধিকাংশ উদাহরণে পূর্ব পদের বিভক্তি লোপ পায় ও উত্তর পদের অর্থ প্রাধান্য থাকে এবং তৎপুরুষ শব্দটি হল এই রীতিতে নিষ্পন্ন সমাষের একটি বিশিষ্ট উদাহরণ। তাই উদাহরণের নামেই এর সাধারণ নামকরণ করা হয়েছে তৎপুরুষ সমাস।
তৎপুরুষ সমাস ছয় প্রকার। যথা:
- (১) দ্বিতীয়া-তৎপুরুষ
দ্বিতীয়া-বিভক্ত্যন্ত পদ পূর্বে থেকে সমাস হলে, তাকে দ্বিতীয়া-তৎপুরুষ বলে। যেমনঃ স্বর্গকে গত = স্বর্গগত।
- (২) তৃতীয়া-তৎপুরুষ
তৃতীয়া-বিভক্ত্যন্ত পদ পূর্বে থেকে সমাস হলে, তাকে তৃতীয়া-তৎপুরুষ বলে। যেমনঃ রজ্জু দ্বারা বন্ধ = রজ্জুবন্ধ।
- (৩) চতুর্থী-তৎপুরুষ
চতুর্থী-বিভক্ত্যন্ত পদ পূর্বে থেকে সমাস হলে, তাকে চতুর্থী-তৎপুরুষ বলে। যেমনঃ যজ্ঞের নিমিত্ত ভূমি = যজ্ঞভূমি।
- (৪) পঞ্চমী-তৎপুরুষ
পঞ্চমী-বিভক্ত্যন্ত পদ পূর্বে থেকে সমাস হলে, তাকে পঞ্চমী-তৎপুরুষ বলে। যেমনঃ মুখ হইতে ভ্রষ্ট = মুখভ্রষ্ট।
- (৫) ষষ্ঠী-তৎপুরুষ
ষষ্ঠী-বিভক্ত্যন্ত পদ পূর্বে থেকে সমাস হলে, তাকে ষষ্ঠী-তৎপুরুষ বলে। যেমনঃ দীনের বন্ধু = দীনবন্ধু।
- (৬) সপ্তমী-তৎপুরুষ
সপ্তমী-বিভক্ত্যন্ত পদ পূর্বে থেকে সমাস হলে, তাকে সপ্তমী-তৎপুরুষ বলে। যেমনঃ দিবাতে নিদ্রা = দিবানিদ্রা।
বহুব্রীহি সমাস
যে সমাসের পূর্বপদ ও পরপদ কারো অর্থ প্রাধান্য পায় না, সমস্ত পদের অর্থ প্রাধান্য পায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে।
প্রধানত বহুব্রীহি সমাস সাত প্রকার:
১। সমানাধিকরন বহুব্রীহি: দশানন—দশ আনন যার
২। ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি: পাপমতি– পাপে মতি যার
৩। মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি: বিড়ালোক্ষী– বিড়ালের অক্ষির মতো অক্ষি যার
৪। অলুক বহুব্রীহি: মুখেভাত– মুখে ভাত দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে।
৫। ব্যাতিহার বহুব্রীহি: লাঠালাঠি– লাঠিতে লাঠিতে যে লড়াই।
৬। না বহুব্রীহি: নির্বাক– নেই(ন) বাক যার।
৭। সহার্থক বহুব্রীহি: সবাক– বাকের সহিত বর্তমান
দ্বিগু সমাস
পূর্ব পদে সংখ্যাবাচক শব্দ বসে সমাহার বা সমষ্টি বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে।
- তদ্ধিতার্থে; যথাঃ পঞ্চ (পাঁচটি) গো দ্বারা ক্রীত = পঞ্চগু।
- উত্তরপদ পরে, যথাঃ পঞ্চ হস্ত প্রমাণ ইহার = পঞ্চহস্তপ্রমাণ। (এখানে প্রমাণ শব্দ উত্তরপদ পরে থাকায় পঞ্চ ও হস্ত এই দুই পদের দ্বিগু সমাস হয়েছে)।
- সমাহারে; যথাঃ ত্রি (তিন) লোকের সমাহার = ত্রিলোক।
- চৌ রাস্তার সমাহার= চৌরাস্তা
- সে(তিন) তারের সমাহার= সেতারা
- শত অব্দের সমাহার=শতাব্দী
- ছয় ঋতুর সমাহার=ষড়রিতু
অব্যয়ীভাব সমাস
অনুবাদ অব্যয় পদ পূর্বে থেকে যে সমাস হয় এবং যাতে পূর্ব পদের অর্থেরই প্রাধান্য থাকে, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। এই সমাসকে বর্তমানে উপসর্গ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: আত্মাকে অধি (অধিকার করিয়া) = অধ্যাত্ম।
Follow Us
Facebook Page: AmarSikkha.com
Linkedin: AmarSikkha.com
Google News: Amar Sikkha
WhatsApp Channel: Amar Sikkha
Telegram: t.me/amarsikkha

[…] বিপরীত শব্দ-প্রসন্ন। • অব্যয়ীভাব সমাস– আমরণ, উপকণ্ঠ। • ‘আগমন’ যে অর্থে […]
[…] আরও পড়ুনঃ সমাস চেনার সহজ উপায় (উদাহরণ সহ) […]