
হাজার পাঠকের প্রিয় একটি উপন্যাস রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি বই ডাউনলোড করতে আজকের পোস্টটি সম্পূর্ণ পড়ুন। রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও আসেননি বইটি লিখেছেন মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন।
রবিন্দ্রনাথা এখানে কখনও খেতে আসেন নি এই রেস্টুরেন্টে একদিন খেতে আসেন ঢাকা থেকে আগত ভদ্রলোক নুরে ছপা। এই রেস্টুরেন্টের খাবার সার্ভ করা থেকে ওয়েটার সকলেই অদ্ভুত রকমের। কিন্তু খাবার এত উচু মানের যেটি নুরে ছপা নামক মানুষটিকে আঙ্গুল চেটে খেতে বাধ্য করেছিলো, যদিও তিনি এভাবে খান না। নুরে ছপার ভাষায় মানুষ সম্মোহিত হয়ে যায় এই খাবারে, তাহলে কি আছে এই খাবারের পেছনের গোপন রহস্য?
রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি
চলুন বইটির কিছু অংশ পড়ে নেওয়া যাক-
দূর থেকে শত শত নারী-পুরুষের কণ্ঠ ভেসে আসছে বসন্তের বাতাসে, সেই সাথে বয়ে নিয়ে আসছে উদ্যানের নাম-জানা না-জানা অসংখ্য ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। দিনের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে, ছড়িয়ে দিচ্ছে উদ্যানের ঘাসের উপরে মিষ্টি রোদের প্রলেপ।
নুরে ছফা বুকভরে সেই ঘ্রাণ আর রোদের গন্ধ নিলো। কিন্তু ভেসে আসা সুর তাকে সম্মোহিত করে নিয়ে চললো শব্দটার উৎসের দিকে। ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো সে।
গুঞ্জন থেকে সুর। সুর থেকে কথা। শতকণ্ঠের আমন্ত্রণ শুনতে পাচ্ছে এখন।
আয়, আয়, আয়।
সে তোমায় খুঁজে যায়।
তাহার মৃদঙ্গরবে
করতালি দিতে হবে…
ঘোরগ্রস্ত সম্মোহন ভেঙে দৃঢ় পদক্ষেপে, কঠিন সঙ্কল্প নিয়ে আরেকবার চোখ বোলালো চারপাশে। শত শত নারী-পুরুষও সম্মোহিত হয়ে একদিকেই ধাবিত হচ্ছে যেনো। সহস্র কপালে সহ লাল সূর্য! কালো মেঘপুঞ্জে চেপে বসেছে শ্বেতশুভ্র ফুলের মেঘ! সেই ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে চারপাশ।
সূর্যের তেজ বাড়ছে ধীরে ধীরে, ছফা টের পেলো তার কপাল ঘেমে উঠেছে, সেই ঘেমে ওঠা কপালে হাত রেখে রোদ আড়াল করে দেখতে লাগলো এবার। কিন্তু দৃশ্যের চেয়ে শব্দটাই প্রকট তার কাছে।
এসো এসো হে তৃষ্ণার জল,
কলকল ছলছল
ভেদ করো কঠিনের ক্রূর বক্ষতল
কলকল্ ছলছল্…
তৃষ্ণার্ত ছফা এগিয়ে চললো আরো সামনের দিকে। বেলিফুলের সৌরভ তার আশেপাশে। হাঁটতে হাঁটতেই চারপাশটা দেখে নিলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, এমন একটি মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে যেটা তার আধো-ঘোর আর আধো জাগরণের মাঝে দুলছে বিগত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে।
তুমি যে খেলার সাথি
সে তোমারে চায়।
তাহারি সোনার তান
তোমাতে জাগায় গান…
সামনেই দেখতে পেলো বিশাল বটবৃক্ষের নিচে জড়ো হওয়া মানুষের দল। লাল-সাদার সমারোহ। তবলার বোল। করতালের টুং টাং। হারমোনিয়ামের বিভ্রান্তিকর স্বর! সঙ্গীতের মুর্ঘনা গ্রাস করে নিয়েছে চারপাশ। হাজার হাজার নারী-পুরুষ ঘাসের উপরে বসে কয়েক শ’ নারী-পুরুষের সমবতে কণ্ঠের গান শুনছে।
এসো হে প্রবল
কলকল ছলছল…
বৈশাখের প্রথম দিনে নুরে ছফা আবারো ধন্দে পড়ে গেলো। একে একে দেখতে লাগলো সবাইকে। তার মন বলছে, এই ভীড়ের মধ্যে সে আছে। কিন্তু তার যুক্তিবুদ্ধি তাতে সায় দিচ্ছে না।
বিগত তিন বছর ধরে হন্যে হয়ে খুঁজে যাচ্ছে একটা মুখ। যেখানেই যায়, যখনই সুযোগ পায়, এই একটা মুখই খোঁজে। গতকাল রাতে হুট করে তার মনে পড়ে যায়, পরদিন পহেলা বৈশাখ। ঢাকার বৈশাখ মানেই ছায়ানট। রমনার বটমূল। সুরে সুরে রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণ সঙ্গীত : এসে হে বৈশাখ, এসো এসো!
আমি আসলেই রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। সেই ছোটোবেলা থেকে। আমার মা খুব ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতো..আমাকেও শিখিয়েছিলো। ছায়ানটের প্রথম দিককার ছাত্র ছিলাম আমি…৬২-তে যখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করা হলো, সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে অনেকের সঙ্গে আমিও ছিলাম…
কথাগুলো ছফার মস্তিষ্কে অনুরণিত হতে থাকে তখন। তার অন্তরাত্মা বলে ওঠে, সে আসবে! নিদেন পক্ষে, আসার সম্ভাবনা আছে।
গত রাতে উত্তেজনার চোটে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারেনি, ভোর হতেই বিছানা ছেড়েছে সে, ছুটে এসেছে এখানে-রমনার এই সবুজ চত্বরে।
নূরে ছফা এমন একটি মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে, যে মুখটি তার নিজের কাছেই ঘোলাটে, অস্পষ্ট। হাজার হাজার মানুষের ভীড়ে সেই মুখটি খুঁজে বের করা রীতিমতো পাগলামি বলেই মনে হচ্ছে এখন।
ঘন্টাখানেক পর কোলাহল থেকে সরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালো সে। মিষ্টি রোদ এখন মাথার তালুতে আঁচ দিচ্ছে, বিদ্ধ করছে দুচোখ। পায়ের নিচে ঘাসগুলো। হাজার হাজার পদভারে পিষ্ট হচ্ছে তারা। সবুজ চত্বরটি এখন লাল-সাদা-নীল-হলুদ রঙে ছেয়ে গেছে। সঙ্গীতের মিষ্টিধ্বণি ছাপিয়ে প্রবল হতে শুরু করেছে মানুষের কোলাহল।
নিজেকে বেমানান লাগছে এখানে। অন্যদের মতো পায়জামা-পাঞ্জাবি নয়, ক্রিমরঙের পোলো শার্ট, গাঢ় নীলের গ্যাবাডিনের প্যান্ট আর পায়ে মোকামিস পরে আছে সে।
সিগারেটে টান দিয়ে আবারো জনসমুদ্রের দিকে তাকালো ছফা। খুঁজে খুঁজে তার চোখ ক্লান্ত। টের পেলো, একটু ঘেমে উঠছে। কিন্তু এখনও হাল ছেড়ে দেবার কথা ভাবছে না।
সিগারেটটা শেষ করে রমনার বটমূলের দিকে পা বাড়ালো। মানুষের ভীড় এখন জনস্রোতে পরিণত হয়েছে। বটমূলের সামনে বসে থাকা দর্শক শ্রোতাদের দিকে চোখ বুলালো। রোদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বেশির ভাগ নারী-পুরুষ মাথার উপরে রুমাল, কাপড়, সানগ্লাস আর সানক্যাপ দিয়ে রেখেছে। তাদের প্রায় সবার চোখ বটবৃক্ষের শান বাঁধানো চত্বরে যে মঞ্চ বানানো হয়েছে তার দিকে থাকার কথা কিন্তু অনেকের দৃষ্টিই অন্যদিকে নিবদ্ধ-উপস্থিত দর্শকদের বিরাট একটি অংশ হাতে মোবাইলফোন নিয়ে নিজেদের অহংকে তুষ্ট করার জন্য অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে ছবি তোলায় ব্যস্ত।
রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি PDF
সেল্ফি!
তিক্ততায় একদলা থুতু ফেললো সে। কালের এই উন্মাদনাকে মেনে নিতে একটু কষ্টই হয় তার। মানুষ এখন নিজেদের প্রতিটি মুহূর্তকে ধরে রাখতে চায়, জানান দিতে চায় তার উপস্থিতিকে! তাদের মতো ডিবি অফিসাররাও বড়সর কোনো ‘ক্রিমিনাল’কে ধরার পর সেল্ফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেয় আজকাল। এ নিয়ে ডিপার্টমেন্টে প্রায়শই বচসা বাধে, আর সেটা সব সময় শুরু করে ছফা নিজেই।
সেক্তি নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে সামনের দিকে তাকালো সে। বটবৃক্ষের শান বাঁধানো চত্বরে বসে বিভিন্ন বয়সের শ’খানেক নারী-পুরুষ গান গেয়ে যাচ্ছে। সূর্যালোকের কারণে চোখের উপরে হাত রেখে মঞ্চে বসা মানুষগুলোর দিকে নজর দিলো এবার। ভীড়ের মধ্যে কাউকে খোঁজার যে কৌশল সেটা তার জানা আছে। ধৈর্য ধরে এক এক করে দেখতে হয়। বিক্ষিপ্তভাবে দেখলে দৃষ্টি বিভ্রান্ত হবে।
হতাশার সাথেই এবার ফিরে তাকালো মঞ্চের সামনে বসে থাকা হাজারখানেক দর্শকের দিকে। এক এক করে দেখতে শুরু করলো সে। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই তার দৃষ্টি চঞ্চল, অসহিষ্ণু আর উদভ্রান্ত হয়ে উঠলো। ক্রমশ হতাশা গ্রাস করলো তাকে। তিক্তমুখে ঘুরে দাঁড়ালো। আরেকটা সিগারেট ধরাবে কিনা সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না। তবে তার পা দুটো ঠিকই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, ভীড় থেকে তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে যেনো।
এখানে হুট করে চলে আসাটা যে কতো বড় পাগলামি হয়েছে, সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। মুশকান জুবেরি এতোটা বোকা নয় যে, হত্যা-গুমের অভিযোগ মাথায় নিয়ে পহেলা বৈশাখে ছুটে আসবে রমনার বটমূলে।
হাঁটতে হাঁটতেই পাশ ফিরে তাকালো সে। সমবেত কণ্ঠের গান থেমে গেছে, শুরু হয়েছে একক পরিবেশনা।
নাই বা ডাকো রইব তোমার দ্বারে,
মুখ ফিরালে ফিরব না এইবারে…
নিজেকে ভীষণ বোকা আর নাছোড়বান্দা বলে মনে হচ্ছে তার। তবে মুশকান জুবেরির ব্যাপারে আর কততদিন হাল না ছেড়ে থাকতে পারবে, জানে না। সুন্দরপুর থেকে পালিয়ে যাবার পর তিন বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। ছফার যৌক্তিক মন জানে, ঐ ভয়ঙ্কর নারী দেশ ছেড়েছে, হয়তো আর কখনও ফিরে আসবে না। ভিনদেশে গিয়ে দিব্যি পুরুষ শিকার করে যাচ্ছে সে, আর নিজেকে করছে কালোত্তীর্ণ!
