
মহেশ গল্প pdf শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর একটি গল্প। মহেশ গল্পের বিষয়বস্তু হলো তৎকালীন নদিয়া জেলায় (বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলা) কাশীপুর জমিদার বাড়ি নামে একটি জমিদার বাড়ি ছিল। এই বাড়িটিতে বিনয় কুমার চট্টোপাধ্যায় ও মিনায় কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে দুইজন জমিদার থাকতেন।
এই অঞ্চলে তাদের জমিদারি ছিল। তারা সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের মামা হতেন। সেজন্য এখানে শরৎচন্দ্রের আসা-যাওয়া ছিল। শরৎচন্দ্রের মামারা খুবই অত্যাচারী ছিলেন। শরৎচন্দ্র যখন এই বিষয়টি জানতে পারেন তখন তিনি খুবই মর্মাহত হন এবং এই জমিদার বাড়িটিতে বসেই তিনি মহেশ নামক গল্পটি রচনা করেন।
মহেশ গল্প ডাউনলোড
মহেশ গল্পের সারসংক্ষেপ এবং বই এর কিছু অংশ নীচে দেওয়া হয়েছে পড়ে নিবেন।
কাশীপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক গফুর। তার মেয়ে আমিনার সাথে সে কোনরকমে একটি জীর্ণ ঘরে জীবনযাপন করে। তার পরিবারের সদস্য বলতে তারা দুই জন আর মহেশ। সে যে গ্রামে থাকে, সে গ্রামের জমিদার শিববাবু ও তার পণ্ডিত তর্করত্ন তাকে গরুর প্রতি অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত করে। তারা গো শব্দের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা করে গফুরকে বোঝালেও নিজেরা গরুকে খাওয়ার জন্য খড় দিতে অস্বীকার করে। টাকার লোভে গ্রামে গরু চরে বেড়ানোর একমাত্র মাঠ বিক্রি করে দেয়।
গল্পের শেষে একটি ঘটনায় মেজাজ হারিয়ে গফুর তার মহেশকে লাঙলের ফলা দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলে, যে মহেশকে সে তার ‘ছেলে’ বলে অভিহিত করেছিল। এরপর সে গ্রামে থাকা সবকিছু ফেলে ফুলবেড়ের চটকলে কাজ করতে চলে যায়। সে যাবার পথে উপরওয়ালার কাছে যারা মহেশের খাবার ঘাস কেড়ে নিয়েছে, খাবার পানি কেড়ে নিয়েছে, তাদের কসুর মাফ না করার ফরিয়াদ জানায়।
মহেশ গল্প – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
গ্রামের নাম কাশীপুর৷ গ্রাম ছোট, জমিদার আরও ছোট, তবু, দাপটে তাঁর প্রজারা টুঁ শব্দটি করিতে পারে না৷—এমনই প্রতাপ৷
ছোট ছেলের জন্মতিথি পূজা৷ পূজা সারিয়া তর্করত্ন দ্বিপ্রহর বেলায় বাটী ফিরিতেছিলেন৷ বৈশাখ শেষ হইয়া আসে, কিন্তু মেঘের ছায়াটুকু কোথাও নাই, অনাবৃষ্টির আকাশ হইতে যেন আগুন ঝরিয়া পড়িতেছে৷
সম্মুখের দিগন্তজোড়া মাঠখানা জ্বলিয়া পুড়িয়া ফুটিফাটা হইয়া আছে, আর সেই লক্ষ ফাটল দিয়া ধরিত্রীর বুকের রক্ত নিরন্তর ধুঁয়া হইয়া উড়িয়া যাইতেছে৷ অগ্নিশিখার মত তাহাদের সর্পিল ঊর্ধ্বগতির প্রতি চাহিয়া থাকিলে মাথা ঝিমঝিম করে—যেন নেশা লাগে৷
ইহারই সীমানায় পথের ধারে গফুর জোলার বাড়ি৷ তাহার মাটির প্রাচীর পড়িয়া গিয়া প্রাঙ্গণ আসিয়া পথে মিশিয়াছে এবং অন্তঃপুরের লজ্জাসম্ভ্রম পথিকের করুণায় আত্মসমর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছে৷
পথের ধারে একটা পিটালি গাছের ছায়ায় দাঁড়াইয়া তর্করত্ন উচ্চকণ্ঠে ডাক দিলেন, ওরে, ও গফরা, বলি, ঘরে আছিস?
তাহার বছর-দশেকের মেয়ে দুয়ারে দাঁড়াইয়া সাড়া দিল, কেন বাবাকে? বাবার যে জ্বর৷
জ্বর! ডেকে দে হারামজাদাকে৷ পাষণ্ড! ম্লেচ্ছ!
হাঁক-ডাকে গফুর মিঞা ঘর হইতে বাহির হইয়া জ্বরে কাঁপিতে কাঁপিতে কাছে আসিয়া দাঁড়াইল৷ ভাঙ্গা প্রাচীরের গা ঘেঁষিয়া একটা পুরাতন বাবলা গাছ—তাহার ডালে বাঁধা একটা ষাঁড়৷ তর্করত্ন দেখাইয়া কহিলেন, ওটা হচ্চে কি শুনি? এ হিঁদুর গাঁ, ব্রাহ্মণ জমিদার, সে খেয়াল আছে? তাঁর মুখখানা রাগে ও রৌদ্রের ঝাঁজে রক্তবর্ণ, সুতরাং সে মুখ দিয়া তপ্ত খর বাক্যই বাহির হইবে, কিন্তু হেতুটা বুঝিতে না পারিয়া গফুর শুধু চাহিয়া রহিল৷
তর্করত্ন বলিলেন, সকালে যাবার সময় দেখে গেছি বাঁধা, দুপুরে ফেরবার পথে দেখচি তেমনি ঠায় বাঁধা৷ গোহত্যা হলে যে কর্তা তোকে জ্যান্ত কবর দেবে৷ সে যে-সে বামুন নয়!
কি কোরব বাবাঠাকুর, বড় লাচারে পড়ে গেছি৷ ক’দিন থেকে গায়ে জ্বর, দড়ি ধরে যে দু-খুঁটো খাইয়ে আনব—তা মাথা ঘুরে পড়ে যাই৷
তবে ছেড়ে দে না, আপনি চরাই করে আসুক৷
কোথায় ছাড়ব বাবাঠাকুর, লোকের ধান এখনো সব ঝাড়া হয়নি—খামারে পড়ে খড় এখনো গাদি দেওয়া হয়নি, মাঠের আলগুলো সব জ্বলে গেল—কোথাও একমুঠো ঘাস নেই৷ কার ধানে মুখ দেবে, কার গাদা ফেড়ে খাবে—ক্যামনে ছাড়ি বাবাঠাকুর?
তর্করত্ন একটু নরম হইয়া কহিলেন, না ছাড়িস ত ঠাণ্ডায় কোথাও বেঁধে দিয়ে দু’-আঁটি বিচুলি ফেলে দে না ততক্ষণ চিবোক৷ তোর মেয়ে ভাত রাঁধেনি? ফ্যানে-জলে দে না এক গামলা খাক৷
গফুর জবাব দিল না৷ নিরুপায়ের মত তর্করত্নের মুখের পানে চাহিয়া তাহার নিজের মুখ দিয়া শুধু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বাহির হইয়া আসিল৷
তর্করত্ন বলিলেন, তাও নেই বুঝি? কি করলি খড়? ভাগে এবার যা পেলি সমস্ত বেচে পেটায় নমঃ? গরুটার জন্যেও এক আঁটি ফেলে রাখতে নেই? ব্যাটা কসাই!
এই নিষ্ঠুর অভিযোগে গফুরের যেন বাকরোধ হইয়া গেল৷ ক্ষণেক পরে ধীরে ধীরে কহিল, কাহন-খানেক খড় এবার ভাগে পেয়েছিলাম, কিন্তু গেল সনের বকেয়া বলে কর্তামশায় সব ধরে রাখলেন৷ কেঁদেকেটে হাতেপায়ে পড়ে বললাম, বাবুমশাই, হাকিম তুমি, তোমার রাজত্বি ছেড়ে আর পালাবো কোথায়, আমাকে পণ-দশেক বিচুলিও না হয় দাও৷ চালে খড় নেই—একখানি ঘর, বাপ-বেটিতে থাকি, তাও না হয় তালপাতার গোঁজা-গাঁজা দিয়ে এ বর্ষাটা কাটিয়ে দেব, কিন্তু, না খেতে পেয়ে আমার মহেশ মরে যাবে৷
