
জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেন কবিতার মূলভাব নিচে দেওয়া হয়েছে। প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, বনলতা সেন কবিতাটি দৈহিক অবয়বে ছোট হলেও ভাবের কলেবরে বৃহৎ। তাই এটিকে উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই। বরং আরও বেশি গুরুত্বসহকারে এই কবিতাটি অধ্যয়ন করা উচিত।
বনলতা সেন কবিতার মূলভাব
পৃথিবীর সচনালগ্ন থেকেই পুরুষ সর্বদা যাকে কামনা করেছে সে হলো একজন নারী। নারীর অনুপস্থিতি যে কোনো পুরুষের হৃদয়ে যেমন অশান্তির বার্তা বয়ে আনে কবি জীবনানন্দ দাশের হৃদয়েও তেমনি অশান্তির বার্তা বয়ে এনেছ। নারীর ভালোবাসায় কিংবা নারীকে কাছে পাওয়ার জন্য যেকোনো পুরুষ পৃথিবীর কঠিনতম কাজও করে ফেলতে পারে। তেমনি বনলতা সেন কবিতায় দেখা যায় কবি জীবনানন্দ দাশ হাজার বছরের পৃথিবীর পথ অতিক্রম করেছেন, সিংহল সমূদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগর পর্যন্ত ঘুরেছেন। শুধু তাই নয়, কবি বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতেও গিয়েছেন এবং আরও দূরবর্তী অন্ধকার বিদর্ভ নগর সমস্তকিছু পরিভ্রমণ করেছেন শুধু দুদণ্ড শান্তির প্রত্যাশায়। এক সময় দীর্ঘ পথ পরিক্রমায়, ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত, অবসন্ন, ফেনাময় হয়ে পড়ে কবির জীবন। শান্তির সন্ধানে কবির এত দিনের পরিশ্রম, এত ত্যাগ বৃথা যায়নি। কবির এই বিষাদময় ও ক্লান্তিকর জীবনে শান্তির প্রতীক হিসেবে তিনি খুঁজে পেয়েছেন এক নারীকে। কবির হৃদয় শীতলকারী, মন হরণকারী, শান্তিদায়িনী সেই নারী বনলতা সেন। বিদিশার নিশার মতো কালো চুল, শ্রাবস্তীর কারুকার্যময় মুখ, পাখির নীড়ের মতো দুটি চোখ এমন উপমায় কবি যে নারীকে উপমিত করেছেন সেই রূপময়ী বনলতা সেনের উপস্থিতির পর কবি যখন তার মুখ থেকে শুনলেন মমতাজড়ানো বাণী ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’ তখন কবির বেদনাক্লিষ্ট, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত জীবনে নেমে এল এক পরম প্রশিান্তি- যে প্রশান্তি প্রতিটি পুরুষের কাম্য।
কবি জীবনানন্দ দাশ বনলতা সেন কবিতায় মূলত তাঁর আত্মচেতনাকে এক গভীর ভাবের আলোকে উদ্ভাসিত করেছেন। তিনি নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন মানবপ্রতিনিধি হিসেবে, যিনি জন্মজন্মান্তর ধরে এতটুকু শান্তির আশায় পথ হাঁটছেন। কিন্তু কেউ তাকে শান্তি দিতে পারেনি। কবি এই হাজার বছরেরর পথ পরিক্রমায় সুদূর অতীত যেমন প্রত্যক্ষ করেছেন তেমনি আধুনিক যুগের বা বর্তমান পৃথিবীর অস্থিরতাকে এবং ঝড়ক্ষুব্ধ অবস্থাকেও দেখেছেন। কবি এত কিছু প্রত্যক্ষ করে বুঝেছেন কোথাও এতটুকু শান্তি নেই। শান্তি কেবল নারীর অকপট প্রেমে, নারীর কোমল পরশে, নারীর মমতাময়ী আশ্রয়ে। মূলত কবির এই অনুভবই মূর্ত হয়ে উঠেছে বনলতা সেন কবিতায়।
