
দিনলিপি বা ডাইরি লেখার নিয়ম না জানলে এইচএসসি পরীক্ষায় লিখতে পারবেন না। প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে মানুষ নানা রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়—কখনো তা সুখের, কখনো বা দুঃখের। কিন্তু প্রায়ই মনে হয় সেই সুখ কিংবা দুঃখই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আর এই শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তিটুকুকে স্থায়ী করে রাখতে চায় মানুষ। কেউ তা নিয়ে গান বা কবিতা রচনা করে, আবার কেউ প্রিয় খাতায় গদ্যে লিপিবদ্ধ করে।
দিনলিপি লেখার ধারণাটাও অনেকটা সেরকম। যখন কোনো ব্যক্তি জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলো দিনলিপিতে লিখে রাখেন, তখন তার মানসিক অবস্থা, ইচ্ছা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাইরের জগত সম্পর্কে জানার আগ্রহ ও ভালোবাসা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। তবে শুধু হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা লিখে রাখলেই তা দিনলিপি হয়ে যায় না। দিনলিপি হতে হলে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয় এবং নিয়মিতভাবে সেই অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করতে হয়।
HSC দিনলিপি লেখার নিয়ম
১. দিনলিপির পৃষ্ঠার একেবারে উপরের ডান বা বাম পাশের তারিখ ও বারের নাম লিখতে হয়। কেননা এর মাধ্যমে বোঝা যায় ঘটনাটি কত তারিখে এবং কি বারে ঘটেছিল।
২. দিনলিপিতে ঘটনার সময় ও স্থানের নাম লিখতে হবে এর মাধ্যমে ঘটনাটির সময় ও স্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
৩. দিনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা এর বিস্তারিত বিবরণ নয়, বরং উল্লেখযোগ্য বিশেষ বিশেষ ঘটনা সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
৪. দিনলিপিতে সহজ, সরল, স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ ভাষায় কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কোন বিশেষ ভাবনা চিন্তা বা কৌতূহলজনক কিছু লিখে রাখা হয়।
৫. দিনলিপিতে নিজের বা উত্তম পুরুষ (আমি, আমরা) লেখা হয়।
৬. দিনলিপিতে সাধারণত কোন অনুষ্ঠান, কোন বিপর্যয়, কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কোন বিশেষ ভাবনাচিন্তা বা কৌতূহলজনক কিছু লিখে রাখা হয়।
৭. দিনলিপির ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত চরিত্রগুলোর পরিচয় সংক্ষেপে তুলে ধরতে হবে।
৮. দিনলিপিতে লেখক এর বর্ণনা বা বিবরণ গোছালো ও পরিচ্ছন্ন লেখা হওয়া উচিত।
৯. দিনলিপি একান্ত ব্যক্তিগত রচনাবলী। এতে নিজস্ব অভিমত দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার ইত্যাদি খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করা চলে।
১০. দিনলিপিতে সব সময় সত্য ও প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে হবে।
দিনলিপি লেখার নমুনা
১। ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শনের দিনলিপি
১৬ আগস্ট, ২০২২
বাগেরহাট।
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজ চলছে। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রস্থল ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। সন্ধ্যার দিকেই হলো জলোচ্ছ্বাস। ঘর ও গাছ চাপা পড়ে মারা গেল দুজন। অনেকেই আহত। খাদ্যসামগ্রী, হাঁড়ি পাতিল, গরু ছাগল ভেসে গেল।
চারদিকে ঘরহারা ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার। রাতের বেলায় ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে সকলেই রওয়ানা হলাম বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে। চিত্রা নদীর দুই পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় কেবল ধবংসচিহ্ন। অসহায় মানুষ নিজেদের হারানো জিনিস খুঁজতে ব্যস্ত। অনেকেই ত্রাণসামগ্রীর আশায় বসে আছে। একজন বৃদ্ধাকে দেখা গেল লাঠি ভর করে ধীর পায়ে আসার চেষ্টা করছেন। আমি নিজেই তার কাছে গিয়ে তার নিঃস্ব অবস্থার কথা জানলাম। তার হাতে খাবারের প্যাকেট তুলে দিলাম। আর আমার গায়ের শালটা তার গায়ে জড়িয়ে দিলাম। ফোকলা মুখে অপূর্ব হাসি ফুটে উঠল। আমি তৃপ্ত ও ধন্য। মনে হলো আমার ত্রাণ বিতরণ করতে আসা সার্থক হলো। কখনো হেঁটে, কখনো গাড়িতে যতদূর সম্ভব এলাকার বিপর্যন্ত অবস্থা ঘুরে ঘুরে দেখলাম এবং অসহায় মানুষের মধ্যে খাবার ও কাপড় বিতরণ করলাম। তারপর ফিরে এলাম বাসায়।
২। কলেজে বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের বর্ণনা দিয়ে দিনলিপি
০৩ মার্চ, ২০২২
কুমিল্লা।
সকাল থেকেই কেমন একটা আনন্দ উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। আমার এ অবস্থা দেখে মা সতর্ক করে দিলেন। রওয়ানা হলাম। কলেজের উদ্দেশ্যে। কলেজে আজ অনুষ্ঠিত হবে বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ২০২২। সাহিত্য প্রতিযোগিতার বিচারকমন্ডলীতে ছিলেন সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, বিশ্বজিৎ ঘোষ ও হুমায়ুন কবীর ঢালী। আর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিচারকমণ্ডলী ছিলেন ফেরদৌসী রহমান, লায়লা হাসান ও আতাউর রহমান। সাহিত্যে ছিল নির্বাচিত বিষয়ে গল্প বলা, সংলাপ লিখন ও স্বরচিত ছড়া আবৃত্তি। আর সাংস্কৃতিক বিষয় ছিল রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, নৃত্য ও অভিনয়। আমি অংশ নিয়েছিলাম সংলাপ লিখন, স্বরচিত ছড়া ও অভিনয়ে। যারা অংশ নিয়েছিল তারা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে চমৎকার করেছিল। বিচারমন্ডলীকে হিমশিম খেতে হয়েছিল প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় নির্বাচন করতে। আমি সংলাপ লিখন ও অভিনয়ে প্রথম ও ছড়ায় দ্বিতীয় হয়েছি। ভয়ে সংলাপ আর গানের কলি ভুলে গিয়েছিল তুহিন ও স্বাগতা। হাততালিতে মুখর ছিল পুরো অডিটোরিয়াম। পুরষ্কার নিয়ে বাসায় ফিরতেই মা-বাবা অভিনন্দন জানিয়ে আদর করেছেন। এ দিনটায় কথা আমি কখনই ভুলব না।
৩। নবান্ন উৎসব উদযাপনের দিনলিপি
২৫ জুলাই, ২০২২
নবান্ন শব্দটি অনেক শুনেছি। শুনেছি এটি একটি শস্যভিত্তিক লোকউৎসব। কিন্তু এ উৎসব কখনো দেখিনি। তাও বগুড়ার একটি গ্রামে আমার বন্ধুর বাড়িতে এসেছি। দেখছি ঢেঁকিতে নতুন চাল ‘গুড়ি’ করা হচ্ছে। রোদে শুকানো হলো সেই চালের গুঁড়ো। ৮-১০টা বড় নারকেল কোরানো হলো। ওদিকে একটি বড় পাতিলে দুধ জ্বাল দেওয়া হলো, আর একটি পাতিলে সুজি। ঘন দুধ, সুজি, কোরানো নারকেল আর খেজুরের গুড় একত্রে মিশিয়ে তৈরি করা হলো পাটিসাপটা পিঠা। একে একে তৈরি হলো ভাপা পিঠা, চিতই, পুলি, রসের পিঠা, ক্ষীর, পায়েস ইত্যাদি। পৌষের সকালে সেগুলো পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে বিতরণ করা হলো এ বাড়িতেও এলো নবান্নের নানা রান্নার সামগ্রী। মাদুর বিছিয়ে আমাদের বসতে দেওয়া হলো। থালায় সাজিয়ে দেওয়া হলো নানা রকম পিঠা, ক্ষীর, পায়েস। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ কী আনন্দে মেতে আছে! নানা গল্প-গুজবে, গানে গানে মুখর গ্রামের মানুষ। তাদের মুখে মুখে সব বাড়ির রান্নার প্রশংসা। বিকেলে শুরুর হলো জারিগান, তারপর পালাগানের আসর। আনন্দ আর ঐতিহ্যের গর্বে আমার মন ভরে গেল। সত্যিই নবান্ন উৎসবের তুলনা হয় না। প্রাণের ভেতর থেকে বেরয়ে এলো- যুগ যুগ বেঁচে থাকো বাংলার নবান্ন উৎসব।
৪। বইমেলা সম্পর্কে দিনলিপি লেখ
৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২
গত বছর বইমেলার স্মৃতি আমি কখনই ভুলতে পারব না। সকালের পড়ার টেবিল ছেড়ে কলেজে গেলাম। আমাদেত বাংলা শিক্ষকের কাছে কয়েকটি বইয়ের নাম চাইলাম, বইমেলা থেকে যেগুলো কিনতে পারি। তিনি আনন্দচিত্তে লিখে দিলেন। সেগুলোর সঙ্গে আমার তালিকায় রাখা বইয়ের নাম স্যারকে দেখালাম। তিনি কো না কোনোটির নেই বললেন। আমি তা মেনে নিলাম। বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে মেলায় যাওয়ার জন্য তৈরি হলাম। মাকে বললাম বই কেনার কথা। মা টাকা দিলেন, বললেন রাত ৮টার আগে বাসায় ফিরতে। বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশের বইমেলার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলাম বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে। ভিড় ছিল না, লাইনে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হলো না; ভিতরে ঢুকে গেলাম। প্রথমেই কিনলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের চিঠি’। মেলায় তালিকার সব বই পেলাম না। এরপর আমার প্রিয় লেখক জাফর ইকবালের কিছু বই কিনলাম। হঠাৎ দেখলাম জাফর ইকবাল স্যার একটি স্টলে বসে পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। আমি তাকে সরাসরি দেখে সত্যি অবাক হলাম। যার বই সে ছোটবেলা থেকে পড়ে আসছি তাকে আজ বাস্তবে দেখে, কথা বলে, অটোগ্রাফ নিয়ে সত্যি অবাক হলাম। আর এ কারণেই এই বইমেলা আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।
৫। শিক্ষাসফরে একদিনের দিনলিপি লেখ
২৬ ডিসেম্বর, ২০২২
সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠলাম। দু’দিনের শিক্ষাসফরে আজ দ্বিতীয় দিন। পুঁথিগত বিদ্যাকে অর্থবহ করতে আমাদের কলেজ প্রতি বছরই শিক্ষাসফরের আয়োজন করে থাকে। ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের প্রতি বিশেষ আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতি বছরই দেশের বিখ্যাত জায়গাগুলো ঘুরে আসার আয়োজন প্রশংসনীয়। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা পঞ্চাশজন শিক্ষার্থীর একটি দল গতকাল এসেছি কুমিল্লার ময়নামতিতে। গত বছর একদল গিয়েছিল বাংলাদেশের লোকশিল্প জাদুঘরে সোনারগাঁওয়ে। আজ সকালে আমরা ময়নামতি পাহাড়ি অঞ্চলগুলো ঘুরে দেখলাম। এখানকার অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাদের মুগ্ধ করেছে। আমরা এখানকার ছবি তুলেছি। এরপর গেলাম বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধ যুগের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে। এলাকার মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখে আমরা অভিভূত হয়েছি। এখানকার বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কে নানা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করলাম। সেগুলো কলেজ বার্ষিকীতে প্রকাশ করব বলে স্যারকে জানালাম। আমাদের সুশৃঙ্খল ঘোরাফেরা, বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ দেখে শিক্ষকরাও আনন্দিত। এখানে দেখে শেখার আনন্দ আমরা নতুন করে উপলব্ধি করলাম। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ঐতিহ্যের এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনের সীমানাকে আরও প্রসারিত করবে। এখানকার ঐতিহাসিক চিহ্ন ও নির্দশনসমূহ সংরক্ষণের জন্য পরামর্শসহ তাঁরা স্বাগত জানালেন। সারাদিন আনন্দে কাটল।
