হাদিসে বর্ণিত জিলহজ্জ মাসের আমল ও ফজিলত

পবিত্র কুরআন এবং হাদিসে অনেক জায়গায় রাসুল (সা.) জিলহজ্জ মাসের আমল ও ফজিলত সম্পর্কে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। সবচেয়ে সেরা আমল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করা। জিলহজ্জ মাস হিজরি বছরের দ্বাদশ ও শেষ মাস, যা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি সময়। এই মাসে হজ পালন করা হয়, যা ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। জিলহজ্জ মাসের ৮ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত হজের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়।

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। কুরআনের সূরা আল-ফজরে এ দশ দিনের শপথ করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “এই দশ দিনে করা নেক আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।” বিশেষ করে ৯ জিলহজ্জ তারিখে ‘আরাফার দিন’ পালিত হয়, যেদিন হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে জড়ো হন। এই দিনে রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ হাদিস অনুযায়ী, এই দিনে রোজা রাখলে আগের ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ পাওয়া যায়।

জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত ও আমল

ইসলামের দৃষ্টিতে জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। এই দিনগুলোকে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন, “শপথ ফজরের এবং দশ রজনীর” (সূরা আল-ফজর: ১-২)। অধিকাংশ তাফসিরবিদের মতে, এখানে ‘দশ রজনী’ বলতে জিলহজ্জের প্রথম ১০ রাত বা দিন বোঝানো হয়েছে।

হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“আল্লাহর কাছে এমন কোনো দিন নেই, যেদিনের নেক আমল জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিনের চেয়ে বেশি প্রিয়।”
(বুখারি, হাদিস ৯৬৯)

এই দিনগুলোতে ইবাদতের গুরুত্ব এত বেশি যে, জিহাদেও এর তুলনা হয় না, যদি না কেউ নিজের জান ও মাল নিয়ে জিহাদে অংশ নিয়ে শহীদ হন। তাই এই সময়ে রোজা রাখা, নামাজ আদায় করা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা ও অন্যান্য নেক কাজ করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

আরও পড়ুন  মহান আল্লাহর পছন্দের মেয়েদের নাম এর তালিকা ২০২৬

১. বেশি নেক আমল করুন:

যিলহজের প্রথম দশ দিনে নফল নামাজ, রোযা, কুরআন তিলাওয়াত ও দান-সদকা বেশি করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এই দিনগুলোতে আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।

২. জিকিরে মনোনিবেশ:

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার”, “আলহামদুলিল্লাহ”—এই সব যিকির বেশি বেশি পড়া উচিত। (মুসনাদে আহমদ: ৫৪৪৬)

৩. নখ-চুল না কাটা:

যারা কুরবানী করবেন, তারা যিলহজের চাঁদ দেখা থেকে কোরবানি দেওয়া পর্যন্ত নখ-চুল কাটবেন না। এটি মুস্তাহাব ও সাহাবীদের আমল দ্বারা সমর্থিত। (মুসলিম: ১৯৭৭)

৪. ১-৯ যিলহজ্ব পর্যন্ত রোযা:

বিশেষ করে ৯ যিলহজ্ব (আরাফার দিন) রোযা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এক বছর পূর্ব ও পরের গোনাহ মাফের উপায়। (মুসলিম: ১১৬২)

৫. তাকবীরে তাশরীক:

৯ যিলহজ ফজর থেকে ১৩ যিলহজ আসর পর্যন্ত (২৩ ওয়াক্ত) ফরজ নামাজের পর একবার করে এই তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব:

“الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلا الله، والله أكبر، الله أكبر، ولله الحمد”

৬. কুরবানী করা:

যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরবানী না করে ঈদগাহে না যাওয়ার বিষয়ে হাদীসেও সতর্কতা এসেছে। (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৭৬৩৯)

জিলহজ্জ মাসের আমল ও ফজিলত

১. হজ্জ পালন করা : সামর্থ্যবান সকল মুসলিমের উপর হজ্জ ফরয (আলে ইমরান ৩/৯৭)। হজ্জ পালনের জন্য প্রস্ত্ততি মূলক কয়েকটি মাস থাকলেও একমাত্র হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদন করা হয় যিলহজ্জ মাসে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, لا ينبغي لأحد أن يحرم بالحج إلا في أشهر الحج، ‘হজ্জের মাস ছাড়া কারো হজ্জের ইহরাম বাঁধা উচিত নয়’।

আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন,لاَ يُحْرَمُ بِالْحَجِّ إِلاَّ فِى أَشْهُرِ الْحَجِّ. فَإِنَّ مِنْ سُنَّةِ الْحَجِّ أَنْ يُحَرَمَ بِالْحَجِّ فِى أَشْهُرِ الْحَجِّ. ‘হজ্জের মাসগুলি ছাড়া ইহরাম বাঁধা উচিত নয়। কারণ হজ্জের মাসগুলিতে ইহরাম বাঁধা হজ্জের সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত।[32] মহান আল্লাহ বলেন,الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُومَاتٌ فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ، ‘হজ্জ হয় সুনির্দিষ্ট মাসসমূহে। অতএব এই মাসসমূহে যে হজ্জ করা স্থির করে নিল, তার জন্য হজ্জের সময় অশ্লীল ও পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়’ (বাক্বারাহ ২/১৯৭)।

আরও পড়ুন  পড়া মনে থাকছে না, জানুন মনোযোগ বৃদ্ধির দোয়া 2026

২. ঈদের ছালাত আদায় করা : এই দশ দিনের অন্যতম আমল হ’ল ঈদুল আযহার ছালাত আদায় করা।

৩. কুরবানী করা : যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের বিশেষ আরেকটি আমল হ’ল কুরবানী করা।

৪. ছিয়াম পালন করা : যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের বিশেষ আমল হ’ল ছিয়াম পালন করা। নবী করীম (ছাঃ)-এর কোন স্ত্রী থেকে বর্ণিত যে,

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَصُومُ تِسْعًا مِنْ ذِى الْحِجَّةِ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ وَثَلاَثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ أَوَّلَ اثْنَيْنِ مِنَ الشَّهْرِ وَخَمِيسَيْنِ-

‘রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যিলহজ্জ মাসের নয় দিন, আশূরার দিন এবং প্রত্যেক মাসের তিন দিন, মাসের দুই সোমবার এবং বৃহস্পতিবার ছিয়াম পালন করতেন’।

৫. যিকর করা : এই দশ দিনের অন্যতম আমল হ’ল আল্লাহর বেশী বেশী যিকর করা তথা তাকবীর, তাহমীদ ও তাহলীল পাঠ করা।

৬. তাকবীর পাঠ করা : তাকবীর তথা আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করা এই দিনগুলির অন্যতম আমল।

৭. চুল ও নখ কর্তন না করা : যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের আরেকটি আমল হ’ল যিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানী পর্যন্ত চুল ও নখ কর্তন না করা।

We will be happy to hear your thoughts

Leave a reply

Amar Sikkha
Logo