
মা ও শিশু সুস্থ রাখতে গর্ভবতী মায়েদের খাবার তালিকা প্রস্তুত করা খুবই জরুরি কারণ মা যদি সুস্থ না থাকে তাহলে শিশু কিভাবে সুস্থ থাকবে। তাই গর্ভ অবস্থায় মায়ের বিশেষ যত্ন নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে প্রতি মাসেই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা ও পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার।
গর্ভাবস্থায় খাবার তালিকা আমরা প্রস্তুত করেছি আপনাদের জন্য এই তালিকা অনুযায়ী খাবার খেতে দিন ইনশাআল্লাহ্ মা ও শিশু সুস্থ থাকবে। আপনার শিশু সুস্থ রাখতে মায়ের জন্য সঠিক খাবার নির্বাচন করুন।
গর্ভবতী মায়েদের খাবার তালিকা নমুনা
গর্ভকালীন সময়ে আপনাকে প্রতিদিন ছয় ধরনের খাবার অবশ্যই খেতে হবে। এই ছয় ধরনের খাবার হলো—
- শর্করা জাতীয় খাবার। যেমন: ভাত ও রুটি
- গাঢ় সবুজ ও রঙিন শাক
- রঙিন ফল ও সবজি
- ডিম
- দুধ জাতীয় খাবার
- মাছ, মাংস ও ডাল
এসবের পাশাপাশি প্রতিদিন যেকোনো ধরনের টক জাতীয় ফল খাবেন। যেমন: আমলকি, আমড়া, জাম, জলপাই, লেবু, জাম্বুরা, কমলা ও মাল্টা। এগুলোতে ভিটামিন সি থাকে। ভিটামিন সি আপনার ও গর্ভের শিশুর ত্বক, রক্তনালী ও হাড় সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া শরীরকে আয়রন শোষণেও সহায়তা করবে।
১ মাস থেকে ৩ মাসের গর্ভাবস্থায় খাবার তালিকা
গর্ভবতী নারীর সারাদিনের খাবার তালিকার একটি নমুনা নিচে তুলে ধরা হয়েছে। এই তালিকাটি ১৮০০ ক্যালরির। উচ্চতা ৫ ফুট ২ ইঞ্চি, গর্ভধারণের আগের ওজন ৫৫ কেজি ও সপ্তাহে ২–৩ দিন হালকা ব্যায়াম করেন এমন নারীর জন্য এই তালিকাটি প্রযোজ্য।
| খাবারের ধরন | পরিমাণ |
|---|---|
| ভাত (লাল চালের হলে ভালো হয়) | ২.৫–৩ কাপ (৫০০–৬০০ গ্রাম) |
| গাঢ় সবুজ ও রঙিন শাক | ১–১.৫ বাটি (২৫০–৩৭৫ গ্রাম) |
| হলুদ অথবা কমলা ফল ও সবজি | ১ বাটি (২৫০ গ্রাম) |
| ডিম | ১টি |
| দুধ | ১ গ্লাস (২৫০ গ্রাম) |
| মাছ অথবা মাংস | ১ টুকরা (৫০ গ্রাম) |
| ঘন ডাল | ২ বাটি (৫০০ গ্রাম) |
উল্লেখ্য, এই তালিকার খাবারগুলো রান্না করার সময়ে প্রয়োজনে সীমিত পরিমাণে তেল ব্যবহার করবেন। অতিরিক্ত রান্নার তেল ব্যবহার খাবারের পুষ্টিগুণ তেমন না বাড়ালেও ক্যালরির পরিমাণ বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দিতে পারে।
৪ মাস থেকে ৯ মাসের গর্ভাবস্থায় খাবার তালিকা
একজন স্বাভাবিক ওজনের ৪ মাস থেকে ৬ মাসের গর্ভবতীর প্রথম তিন মাসের চেয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৪০ ক্যালরি পরিমাণ অতিরিক্ত খাবার খাওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে একজন স্বাভাবিক ওজনের ৭ মাস থেকে ৯ মাসের গর্ভবতীকে অন্যান্য সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৪৫০ ক্যালরির খাবার খেতে হবে। তবে আপনার ওজন বেশি হলে আরেকটু কম পরিমাণে অতিরিক্ত খাবার খেতে হবে।
অতিরিক্ত খাবারের চাহিদা পূরণে প্রতিদিন তিন বেলার খাবার খাওয়ার পাশাপাশি দিনে আরও দুই বার হালকা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করবেন। খাবারটি হতে পারে একটি ফল, ৫–৬টি বাদাম অথবা আধা কাপ টক দই। এ ছাড়াও ক্ষুধা লাগলে আপনি যেকোনো সময়েই পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে নিতে পারেন।
শর্করা জাতীয় খাবার তালিকা
গর্ভকালীন সময়ে মায়ের শরীরের অতিরিক্ত ক্যালরির চাহিদা মেটাতে খাবার তালিকায় শর্করা থাকা অপরিহার্য। কিছু শর্করা জাতীয় খাবার হলো—
- ভাত
- রুটি
- আলু
- সিরিয়াল বা কর্ন ফ্লেকস
- নুডলস ও পাস্তা
- ভুট্টা
- ওটস
তবে প্রক্রিয়াজাত শর্করা (যেমন: সাদা চাল ও আটা) খাওয়ার চেয়ে গোটা শস্য দানা (যেমন: লাল চাল ও লাল আটা) ও খোসাসহ আলু খাওয়া ভালো।
ফল ও শাকসবজি
আপনি গর্ভাবস্থায় প্রায় সব ধরনের শাকসবজি ও ফল খেতে পারবেন। যেমন—
| শাকসবজি | ফল |
|---|---|
| গাজর | আম |
| মিষ্টি আলু | কলা |
| মিষ্টি কুমড়া | কমলা |
| পালং শাক | মাল্টা |
| টমেটো | জাম্বুরা |
| মটরশুঁটি | বাঙ্গি |
| ক্যাপসিকাম | পেয়ারা |
প্রোটিন জাতীয় খাবার তালিকা
আপনার শিশুর শারীরিক গঠন ও বৃদ্ধির জন্য আপনাকে অবশ্যই গর্ভকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণে প্রোটিন জাতীয় খাবার খেতে হবে। এমন কিছু প্রোটিন জাতীয় খাবার হলো—
- মাছ (গর্ভকালীন সময়ে সপ্তাহে অন্তত ২৮০ গ্রাম মাছ খাওয়ার চেষ্টা করবেন।)
- মাংস
- ডিম
- দুধ
- ডাল
- মটর, শিম ও মটরশুঁটি
- বাদাম
তবে মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ খাওয়ার সময়ে এসব খাবার ঠিকমতো সিদ্ধ হয়েছে কি না সেই বিষয়ে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। তৈলাক্ত মাছে থাকে গুরুত্বপূর্ণওমেগা-৩ফ্যাটি এসিড। এটি গর্ভের শিশুর সময়ের আগেই জন্ম হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রতিরোধ করে।
গর্ভবতী মায়ের নিষিদ্ধ খাবার তালিকা

গর্ভবতী মায়ের নিষিদ্ধ খাবার তালিকা
গর্ভবতী মায়েদের নির্দিষ্ট কিছু খাবার থেকে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর তা গর্ভধারণ সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি করতে পারে। গর্ভধারণকালে আপনাকে যেসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে:
- কাঁচা, পাস্তুরায়ন ছাড়া দুধ এবং ওই ধরনের দুধ থেকে তৈরি কোমল পনির। এগুলোতে লিসটেরিয়া নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা লিসটেরিওসিস নামের এক ধরনের রোগ তৈরি করতে পারে।
- মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার। কারণ সেগুলোতে ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।
- কাঁচা ও পুরোপুরি রান্না না হওয়া মাংসজাত পণ্য যেমন সসেজ ও কোল্ড কাট। এগুলোতে টোকসোপ্ল্যাজমা গনডির মতো পরজীবী এবং সালমোনিলা ও লিসটেরিয়ার মতো ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।
- কাঁচা মাছ ও সিফুড। কারণ এগুলোতে উচ্চমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী থাকতে পারে।
- কিছু মাছে উচ্চ মাত্রায় পারদ (মার্কারি) থাকে এবং এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। বেশির ভাগ শিকারি মাছ যেমন হাঙ্গর, সোর্ড ফিশ, মার্লিন ও কিং ম্যাককেরেলে মার্কারি বেশি থাকে।
- স্মোকড কিন্তু রান্না না করা মাছ যেমন, স্মোকড স্যালমন।
- রান্না না করা অঙ্কুরিত বীজ, খাদ্যশস্য ও শিম। কাঁচা মূলা, শিম ও আলফালফার বীজ এবং রেডি-টু-ইট সালাদ এসব খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এগুলোতে লিসটেরিয়া, সালমোনিলা ও ই. কোলির মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।
- কাঁচা বা কম সিদ্ধ ডিম। এতে সালমোনিলা ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।
- যকৃত (লিভার) ও অন্যান্য অঙ্গের মাংস। যকৃতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকলেও এটা গর্ভধারিণী নারীদের খেতে বলা হয় না। কারণ এতে উচ্চমাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ থাকে এবং এই মাংসে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে।
আপনার সন্তান ও গর্ভবতী মা সুস্থ থাকুক এই প্রত্যাশা করছি। প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন।
